নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: কথায় আছে-‘যে ভাঙ্গতে জানে, সে গড়তেও জানে’। ঠিক যেন তেমনটাই, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান।

যারা এতদিন ভাবতেন বা অভিযোগ করতেন যে, শামীম ওসমানের কারনেই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দরা নানা ইস্যুতে বিভাজনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এখন আবার তারাই শামীম ওসমানের পাশে সেই সকল শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের ঐক্যের সূচনার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন।

আর আজ সেই শামীম ওসমানের দ্বারাই বিভক্ত থাকা শীর্ষ নেতৃবৃন্দরা একত্রিত হওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন, ‘শামীম ওসমানের কারনে যদি দলীয় নেতৃবৃন্দরা বিভক্ত হতে পারেন, তেমনি তার আহ্বানেই আবার শীর্ষ নেতারা একত্রিতও হতে পারেন।’

কেননা, বরাবরই বিভিন্ন সভা সমাবেশে স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে আসছিলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই, সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদল, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন, সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহাসহ হেভীওয়েট নেতৃবৃন্দরা।

কিন্তু নানা ইস্যুতে খোদ এই সকল শীর্ষ নেতাদের মাঝেই ছিল বিরোধ। আর গত বছর ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনের পর থেকে চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত যেই বিভাজন ছিল সকলের মাঝে দৃশ্যমান। যার নেপথ্যে কোন না কোন ভাবেই শামীম ওসমানের নাম উঠে আসতো।

যেমনটা গত বছর অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন প্রথমাবারের মত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যাওয়ায় তার সাথে মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাইয়ের মনস্তাত্বিক দ্বন্দের সৃষ্টি হয়ে যায়।

যার ফলে দলীয় কোন কর্মসূচীতে উভয়ে উপস্থিত থাকলেও কেউ কারো সাথে কথা বলতেন না। একর্যায়ে উভয়ের মধ্যে বিভাজন তৃণমূলের মাঝে অনেকটা দৃশ্যমান হয়ে যায়। আর আনোয়ার হোসেনের মনোনয়ন নিশ্চিতে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন সাংসদ শামীম ওসমান।

এরপর, মহানগর আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহার বিরুদ্ধে একটি লিফলেট বিলি করার অভিযোগে জেলা আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদলের সাথে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়ে যায়।

তারপর, গত ২৮ মে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই ও সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদলের সুপারিশে ইয়সমিন চৌধুরী লিন্ডাকে আহবায়ক ও সৈয়দা ফেরদৌসি আলম নীলা, সাবিরা সুলতানা নীলা, নিলুফার ইয়াসমিন, ফারিয়া আক্তার হেলেনা, হাসিনা বেগমকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট যুব মহিলালীগ নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি এবং মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন ও সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহার সুপারিশে ৩০ মে নুরুন্নাহার সন্ধ্যাকে আহবায়ক ও সালমা আক্তার, শারমীন আক্তার ডলি, মায়ানূর মায়া, চায়না আক্তার, রুম্পা আক্তারকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৪৯ সদস্য বিশিষ্ট যুব মহিলালীগ নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটির অনুমোদন দেন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাজমা আক্তার ও সাধারন সম্পাদক অপু উকিল।

এরপর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের সুপারিশে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাজমা আক্তার ও সাধারন সম্পাদক অপু উকিল নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের নারী সদস্য সাদিয়া আফরিনকে আহবায়ক ও শারমিন আক্তার মেঘলা, আসমা আক্তারকে যুগ্ম আহবায়ক করে জেলা যুব মহিলালীগ এবং এড. স্ইুটি ইয়াসমিনকে আহবায়ক ও মুনিরা সুলতানাকে যুগ্ম আহবায়ক করে মহানগর যুব মহিলালীগের আরেকটি কমিটি অনুমোদন দেয়।

কমিটি অনুমোদনের সময় মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বিদেশে থাকলেও পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরেই মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহাকে নিয়ে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে নালিশ দিতে চলে যান ঢাকায়। দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে উভয়ে দেন বিচার।

তন্মধ্যেই স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে শামীম ওসমান সম্পর্কে আক্রমনাত্মক বক্তব্য দেয় মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা। তিনি বলেন, ‘শামীম ওসমানের পছন্দের ব্যাক্তি না হলেই সে হয়ে যায় রাজাকার পুত্র আর নারীদের চরিত্র খারাপ’।

মহানগর আওয়ামীলীগের শীর্ষ এই তিন নেতার শামীম ওসমান বিরোধী আচরনের কারনে আগুন জ¦লে যায় আওয়ামীলীগসহ অঙ্গসংগঠনে। ক্ষোভে ফুঁসে দলীয় নেতাকর্মীরা এই তিন নেতার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মন্তব্যের ঝড় তুলেন।

কিন্তু তখন সাংসদ শামীম ওসমান স্বপরিবারে বিদেশে অবস্থান করছিলেন। এরই মধ্যে, গত ১৭ জুলাই খোকন সাহা ও মাহমুদা মালা ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়কে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে ফের দ্রোহের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়।

তারপরেও সাংসদ শামীম ওসমান, মান অভিমান ভুলে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ১২ আগষ্ট নগরীতে নিজ উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণকালের সর্ববৃহৎ শোক র‌্যালীতে যোগ দিতে আব্দুল হাই, ডা: সেলিনা হায়াত আইভী, আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

শামীম ওসমান প্রত্যাশা করেছিলেন, অত্যন্ত পক্ষে জাতির পিতার স্মরণে সকলেই শোক র‌্যালীতে উপস্থিত হবেন। কিন্তু দূর্ভাগ্য ব:শত সেই শোক র‌্যালীতে বিভিন্ন অজুহাতে আব্দুল হাই, আইভী, আনোয়ার হোসেন এবং খোকন সাহা আর যোগদান করেননি।

সর্বশেষ, গত মাসে অনুষ্ঠিত আওয়ামীলীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭১ তম জন্মদিন জেলা আওয়ামীলীগের ব্যানারে পৃথক ভাবে উদযাপনের মাধ্যমে জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই ও সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদলের মধ্যেও বিভাজনের দৃশ্য প্রকাশ পায়।

যার ফলে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ঐক্যের আহ্বান জানানোকারী খোদ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মাঝেই বিভাজন সৃষ্টি হতে থাকায় দু:শ্চিন্তায় পড়ে যান দলীয় নেতাকর্মীরা।

কিন্তু সকল মান অভিমান ভুলে শামীম ওসমানের আহ্বানে গত ১৫ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘ডিএনডি বাঁধের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর’ সমাবেশে একমঞ্চে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই, সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদল, মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন ও সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা পাশাপাশি বসে সকলেই একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে অবশেষে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে ঐক্যের পথ সৃষ্টি হয়েছে। আর যদি সিটি মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীও শামীম ওসমানের সাথে আর অভিমান করে না থেকে একত্রিত হন তাহলে সেদিনই হবে আওয়ামীলীগ প্রকৃতপক্ষে ঐক্যবদ্ধ বলে আশা প্রকাশ করেছেন তৃণমূল নেতৃবন্দ।

তাই তাদের দাবী, ১৫ অক্টোবর থেকে ঐক্যের পথে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের শুরু হওয়া যাত্রা যেন আর কোন বাঁধার কারনে বিভক্ত হয়ে না পড়ে। যদি এই ঐক্যের পথের সহযাত্রীরা সত্যিকার অর্থেই একতাবদ্ধ থাকেন, তাহলে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে কোন আসনেই ‘নৌকার’ প্রার্থীকে কেউ পরাজিত করতে পারবেনা। র পথে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here