নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: প্রথমবারের মত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় দ্বিতীয় বারও মেয়র পদে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি খোদ নিজ দলের মধ্যেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ডা: সেলিনা হায়াত আইভীকে।
কারন, প্রথমবার নির্দলীয় ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে দলীয় সমর্থণে শামীম ওসমান মেয়র প্রার্থী হওয়ায় যেমন কঠিন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে বিজয়ী হয়ে নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করতে হয়েছিল আইভীকে, তেমনি দ্বিতীয় মেয়াদের সিটি নির্বাচনে চির প্রতিদ্বন্দী শামীম ওসমান প্রার্থী না হলেও দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনের আগ মুহুর্ত থেকে একদিকে নিজের দলীয় কোন পদ না থাকা, অপরদিকে নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেনের পক্ষে সাংসদ শামীম ওসমানের সমর্থণ জানানো, আবার বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচনে বিএনপির অংশ গ্রহণের কারনে আইভীকে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল।

কিন্তু তার মনোবল ছিল দৃঢ়, ছিল দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। যদি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন কাউকে দেয়া হয়, তবে সেটা নেত্রী তাকেই দিবেন।

ঠিক যেন তেমনটাই হয়েছিল সবক্ষেত্রে। দীর্ঘ দেড়যুগ যাবত যেখানে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ কমিটিহীন অবস্থায় ছিল, সেখানে সিটি নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের তিন সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটির অনুমোদন দিয়ে দেন।

গত বছরের ৯ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাইকে সভাপতি ও এড. আবু হাসনাত মো: শহীদ বাদলকে সাধারন সম্পাদক করে গঠিত এই তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে ডা: সেলিনা হায়াত আইভীকে পদায়ন করেই সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে দেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।

কিন্তু তারপরেও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যান আনোয়ার হোসেন। আর তার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থণ দেখিয়ে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণে পৌর ওসমানী স্টেডিয়ামে বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করেন আইভীর একমাত্র প্রতিপক্ষ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের আওয়ামীলীগের হেভীওয়েট সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান।

এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে নিয়ম অনুযায়ী তিনজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নামের তালিকা আওয়ামীলীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচনী মনোনয়ন বোর্ডের নিকট প্রেরণের ক্ষেত্রে আইভীর নাম বাদ দিয়ে আনোয়ার হোসেনসহ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী না হওয়া সত্ত্বেও বন্দর থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আব্দুর রশীদ ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ মজিবুর রহমানের নামের প্রস্তাব পাঠায় মহানগর আওয়ামীলীগ।

কিন্তু তাতে কি, তারপর খোদ নিজেই দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় আওয়ামীলীগের মনোনয়ন বোর্ডের নিকট আবেদন করেন ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।

এরপর আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৮ নভেম্বর ২০১৬। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সকল সদস্যদের সম্মতিক্রমে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে শেষতক মহানগর আওয়ামীলীগের তালিকা থেকে বাদ দেয়া মেয়র প্রার্থী আইভীকেই দলীয় মনোনয়ন প্রদান করেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ হাসিনা।

 


দ্বিতীয় ধাপেও ‘নৌকা’ প্রতীক ছিনিয়ে এনে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে প্রথমবারের মত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘নৌকার’ বিজয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন আইভীসহ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ, শুভাকাঙ্খী, আত্মীয় স্বজনসহ সাধারন জনতা।

নির্বাচনী প্রচারনায় আইভী যেখানেই যেতো, সেখানেই আগে থেকে ফুল নিয়ে তাকে অভ্যর্থণা জানাতে জড়ো হয়ে যেতো হাজারো জনতা। যা দেখে আইভীর জন্য ‘নৌকার’ প্রচারনায় আসা কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা হতবাক হয়ে যান।

তারপর নারায়ণগঞ্জে ‘নৌকার’ বিজয় নিশ্চিত করতে স্বয়ং দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা আইভী ও শামীম ওসমানসহ নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দদের গণভবনে তলব করে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

পরবর্তীতে অতীতের মান অভিমান ভুলে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে ‘নৌকার’ জয় নিশ্চিতে আইভীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন চির প্রতিদ্বন্দী শামীম ওসমান। কিন্তু তখন তিনি সংসদ সদস্য থাকায় নির্বাচনী আচরন বিধি অনুযায়ী মাঠঘাটে ঘুরে ভোট প্রার্থণা করতে না পারলেও দলীয় নেতাকর্মীদের আইভীর পক্ষে ভোট প্রার্থণার নির্দেশনা দেন। আর নিজে যতটুকু পেরেছেন মিডিয়ার মাধ্যমে ছোট বোন আইভীর জন্য জনগণের কাছে ‘নৌকার’ পক্ষে রায় দেয়ার আকুতি জানান।

পরিশেষে গত বছর ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী এড. সাখাওয়াত হোসেন খানকে ৭৭ হাজার ৯০২ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে ‘নৌকার’ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হন ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।

সদর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অধীনস্থ ২৭ টি ওয়ার্ডের মোট ১৭৪টি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ডা: সেলিনা হায়াত আইভী ‘নৌকা’ প্রতীকে পান ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০২ ভোট। আর বিএনপি মনোনীত পরাজিত প্রার্থী এড. সাখাওয়াত হোসেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে পান ৯৬ হাজার ৭০০ ভোট।

দ্বিতীয় মেয়াদে নগর মাতা নির্বাচিত হওয়ার পর আইভী সংবাদ মাধ্যমে দেয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই বিজয়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও নারায়ণগঞ্জবাসীকে উৎস্বর্গ করেন।

এরপর পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনের পরদিন বিএনপির পরাজিত মেয়র প্রার্থী এড. সাখাওয়াত হোসেন খানের বাড়ীতে ঠিকই মিষ্টি নিয়ে সৌজন্য সাক্ষাত করতে যান আওয়ামীলীগের বিজিত মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। একসাথে উভয়ে দীর্ঘক্ষণ কুশলাদি বিনিময় করেন। পাশাপাশি একে অপরকে মিষ্টিমুখও করান।

যা কিনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ছিল, ঐতিহাসিক ভাবে আইভীর ‘নৌকা’ বিজয়। শুক্রবার বছর ঘুরে আবারো এলো সেই ২২ ডিসেম্বর ২০১৭। অর্থাৎ আইভীর সেই ঐতিহাসিক ‘নৌকা’ বিজয় এবং টানা দ্বিতীয় মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বর্ষপূতি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here