নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: পঞ্চবটীতে পার্ক নির্মান, ফ্ল্যাট ও দোকান বরাদ্দের অনিয়মসহ তিনটি বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেলেও এই ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো কোনরূপ জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই আইভীকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)!
যার ফলে দুদকের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। তাদের প্রশ্ন, স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটি যদি মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে দুদকের অনুসন্ধানকারী টিম পেল না কেন? তবে কি স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটির সদস্যরা আইভীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির প্রমাণ অভিযোগকারী সাংসদ শামীম ওসমানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পেয়েছিলেন, নাকি আইভীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দুদক তাকে দায়মুক্তি দিলেন?

সচেতন মহলের মতে, যেখানে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণ তুলে ধরে আইভীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে দুদক কে চিঠি দিয়েছিলেন, সেখানে দুদক আইভীকে কোনরূপ তলব না করেই জিজ্ঞাসাবাদ ব্যতীত কিভাবে দুর্নীতির অনুসন্ধান পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন তা বোধগম্য নয়।

জানাগেছে, বিগত ২০১৫ সালের ৪ মার্চ জাতীয় সংসদের ৫ম অধিবেশনে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ তোলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান। তিনি এ বিষয়ে কয়েকটি লিখিত প্রশ্ন উপস্থাপন করেন।

এরপর সাংসদের প্রশ্ন ও অভিযোগের সূত্র ধরেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল এ সংক্রান্ত তদন্ত টিম গঠন করে।
দফায় দফায় নারায়ণগঞ্জে এসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক মাধব রায়ের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি নাসিকের তিনটি বিষয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পায়। এ তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য ছিলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-২ অধিশাখার উপসচিব কাজী আসাদুজ্জামান ও নারায়ণগঞ্জ জেলার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ছিদ্দিকুর রহমান।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পার্ক নির্মাণসহ দোকান ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারীরা এমন সব অনিয়মের সন্ধান পান, যাতে মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এই বিষয়ে আইনী ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার যেহেতু দুদকের, তাই রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থাটিকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে চিঠি পাঠানো হয়।

তারপর সেই বছরের আগস্টে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিটি কর্পোরেশন শাখার উপ সচিব সরোজ কুমার নাথের সই করা একটি চিঠি দুদক এর তৎকালীন সচিব মাকসুদুল হাসান খানের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইন অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তাদের স্ত্রীরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবসায়ীক কর্মকান্ডে অংশীদার হতে পারেন না। অথচ ফতুল্লার পঞ্চবটীতে বিনোদন পার্ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনালের দুজন অংশীদারের একজনের স্বামী চুক্তি সম্পাদনের সময় নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় (বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন) এবং আরেকজনের স্বামী ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত ছিলেন। স্বামীর তথ্য গোপন করে তারা তখন বাবার নাম ব্যবহার করেন। ব্যবসায়ীক কোম্পানীর অংশীদার হওয়ার জন্য কোনো অনুমতিও তারা নেননি। এরা হলেন কানিজ ফাতেমা ও লীজা আক্তার।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত লংঘন করে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও পার্কটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে বুঝিয়ে দেয়নি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল। অথচ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

কানিজ ফাতেমার স্বামী মো. অরুণ মোল্লা তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় কর্মরত ছিলেন। লীজা আক্তারের স্বামী শামসুল আলম কর্মরত ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে। জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনালের অংশীদার বা পরিচালক লীজা আক্তার ও কানিজ ফাতেমাকে দিয়ে কোম্পানী করে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার আওতাধীন এলাকায় পার্কে অস্থায়ী স্টল নির্মাণের চুক্তি করে ৪০ থেকে ৫০টি স্থায়ী দোকান নির্মাণ করেন। বিষয়টি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ জেনেও চেপে গেছে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন যে তথ্য দিয়েছে তাও সঠিক ছিল না বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ছিল।

প্রতিবেদনে মেয়রের বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন মার্কেটে দোকান ও ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেয়ার অভিযোগও আনা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ৯.২ অনুচ্ছেদে পর্যালোচনা ও মন্তব্য অংশে বলা হয়, চাষাঢ়া পৌর (সিটি) মার্কেটের ২য় তলার ৪ নং এবং ৫ নং দোকানটি জনৈক আবু সাইদের স্ত্রী আয়েশা বেগমের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের কথা উল্লেখ করে আরেকটি দোকান আবু সাইদকেও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ এ সংক্রান্ত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো ব্যক্তিকে বা তার পরিবারের সদস্যদের একটির বেশী দোকান বরাদ্দ দেয়া যাবে না।

তারপর চিঠি প্রাপ্তির পর স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রাথমিকভাবে যাচাই করে অনুসন্ধানের জন্য দুদক তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করে। এ টিমে ছিলেন, দুদকের উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী, সহকারী পরিচালক শেখ আবদুছ সালাম এবং উপ-সহকারী পরিচালক সেলিনা আক্তার মনি।

এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর দুর্নীতি অনুসন্ধানে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আর আইভীর বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্তে প্রামাণিত অভিযোগ প্রায় দুই বছর যাবত অনুসন্ধান শেষে চলতি ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে দুদক।

দুদকের সচিব হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে (স্মারক নং-দুদক/অনু: ও তদন্ত-১/অনু:-২০৭/নারায়ণগঞ্জ/২০১৫) বলা হয়, উপযুক্ত বিষয়ে সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখিত অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক পরিসমাপ্তি করা হয়েছে।

চলতি বছরের গত ১৬ অক্টোবর দুদকের তৎকালীন সচিব মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠির অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের সচিব, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরণ করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here