নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ‘বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় রাজউক যখন নগরীর চাষাড়াস্থ হকার্স মাকের্টের জায়গাটি দখল করে নিতে চেয়েছিল, তখন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর সাথে আমরা এই জমি রক্ষার্থে ঢাকায় রাজউক কার্যালয় ঘেরাও করেছিলাম। সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের দিকে বন্দুকের নল তাক্ করে রেখেছিল, কিন্তু আমরা তাতেও রাজপথ ছাড়ি নাই। পরবর্তীতে মেয়র রাজউক কার্যালয়ে আসার পর তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এই জমিটি হকার্স মার্কেটের জন্য মেয়র আইভীর নিকট হস্তান্তর করে দেন।’

‘কিন্তু আজ সেই মেয়র আইভীর হিংস্র থাবায়ই আমরা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলাম। শীতের মৌসুমে ব্যবসা করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে যেই মালামাল গুলো কিনছিলাম, সেগুলো ফেরত তো পাইলামই না, উল্টো চোখের সামনে সেগুলো আগুনে পুড়ানোর দৃশ্য দেখে একপর্যায়ে মনে হয়েছিল, জ¦লন্ত আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজেই করে ফেলি আত্মহত্যা। কারন, একদিকে হয়েছি ঋণগ্রস্থ, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের মুখে কিভাবে আহার তুলে দিব, সেই চিন্তায় এখন দিশেহারা হয়ে গেছি আমরা।’

শুক্রবার (১৭ নভেম্বর) এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে এমনই আক্ষেপের কথা জানান নগরীর চাষাড়া এলাকায় ফুটপাতে ব্যবসা করে আসা ক্ষতিগ্রস্থ হকার নেতা আসাদ মিয়া।

তবে শুধু আসাদ মিয়াই নয়, গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের কবলে পড়ে সমস্ত মালামাল খুঁইয়ে এখন দিশেহারা হয়ে গেছেন ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় শতাধিক হকার।

তারা শুধু একটি ঘটনাকে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। যেটি হলো, যেই মেয়র আইভী মাস খানেক পূর্বেও হকারদের পুনর্বাসনের ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন, এখন হঠাৎ করেই সেই মেয়র এতটাই হিংস্রাত্মক কিভাবে হলেন? আগে উচ্ছেদের সময় মাল নিয়ে চলে গেলেও পরবর্তীতে জরিমানা দিয়ে সেগুলো পুনরায় ফেরত নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ পেতেন হকাররা। কিন্তু এবার মেয়র ফুটপাতের পাশাপাশি বিভিন্ন মাকের্টের মধ্যে রাখা মালামাল গুলোও তুলে নিয়ে একেবারে দিলেন আগুনে জালাইয়া।

ক্ষতিগ্রস্থ হকাররা মেয়র আইভীর কাছে দাবী করে বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ফুটপাতে বসে ব্যবসা করবো। অত্যন্ত পক্ষে এই সুযোগটি যেন আমাদের দিয়ে করে দেন পরিবার নিয়ে বাঁচার ব্যবস্থা।’

অন্যথায় পেটের তাগিদে আন্দোলন করা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় থাকবে না বলেও হুঁশিয়ারী দেন নগরীর ফুটপাতের হকাররা।

উল্লেখ্য, নগরীর ফুটপাতের হকার ইস্যুতে সম্প্রতি স্থানীয় এমপি, ডিসি ও এসপির সাথে এক প্ল্যাটফর্মে পৌঁছেছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। প্রত্যেকেই হকারদের উচ্ছেদের পূর্বে পুনর্বাসনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সহিত নিয়েছিলেন।

যেই কারনে নগরীর ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ নিয়ে কঠোর মনোভাবে থাকার পরেও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ সেলিম ওসমান কিছুটা নমনীয় হন। তিনি অনুধাবন করতে পারেন, যদি পুনর্বাসন ছাড়া হকারদের উচ্ছেদ করা হয় তাহলে পেটের তাগিদে ব্যবসা করার সুযোগ বঞ্চিত হয়ে হকাররা অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। তাই তো তিনি গত ১৭ আগষ্ট জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জ সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত নগরীর যানজট নিরসনে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে মত বিনিময় সভায় হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ^াস দেন।

সেলিম ওসমান বলেন, ‘ফুটপাতের হকারদের একেবারে কোন পুনর্বাসন ছাড়া উঠিয়ে না দিলে তারা কি করবে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় দেশে ফুটপাতের উপর হকার ব্যবসা করছে। কিন্তু তা হচ্ছে একটা নিয়মের মধ্যে। আমরা তাদের ট্রেড লাইসেন্স দিবো না, কিন্তু একটা নিয়মের মধ্যে আনতে পারবো। নগরীর যানজট নিরসনে একে একে সকল উদ্যোগই নেয়া হবে। কিন্তু তা সহনশীল উপায়ে, পর্যায়ক্রমে।’

এরপর নগরীর ফুটপাতের উপর বসা হকারদের উচ্ছেদে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী কঠোর অবস্থানে থাকলেও তিনিও কিছুটা নমনীয় হন।

ইচ্ছে পোষণ করেন নগরীর ভাসমান হকারদের পুনর্বাসনের। কিন্তু ইচ্ছে পূরণে বাঁধা রাজধানী উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আর সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত জমির অভাব।

গত ৮ আগষ্ট সকাল সাড়ে ১১টায় নগর ভবনে রাজউক আয়োজিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫ইং) (ড্যাপ) এর বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারনের সাথে মতবিনিময় সভায় মেয়রের বক্তব্যে এমনই মনোভাবের বহি:প্রকাশ ঘটে।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো: সিরাজুল ইসলাম, কাউন্সিলরবৃন্দ, নাগরিক সমাজের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় মেয়র আইভী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীও চায় গরীব হকারদের পুনর্বাসন। কিন্তু চাষাড়ায় নির্মিত সিটি কর্পোরেশনের সেই হকার্স মার্কেট এখন রাজউক বিক্রির পাঁয়তারা করছে। যদিও আমি হাইকোর্টে রীট করে সেই জমি বিক্রি বন্ধে স্থগিতাদেশ জারি করিয়েছি। কিন্তু তারপরেও জায়গার সংকুলানের কারনে হকারদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হচ্ছে না।’

এদিকে, গত বছর রমজানের সময় সিটি কর্পোরেশন যখন নগরীর ফুটপাতের হকারদের উচ্ছেদ করেছিল তখন তারা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের দ্বারস্থ হলে সাংসদ হকারদের ফুটপাতে সু-শৃংখল ভাবে ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশ দেন।

এরপর চলতি বছর মানবিক দিক বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীও রমজান মাসে ফুটপাতে হকারদের ব্যবসা করার সুযোগ দেন। যেই কারনে জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া ও পুলিশ সুপার মো: মঈনুল হকও হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে উচ্ছেদের আহবান জানান।

এমনকি একটি সভায় বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের হকার উচ্ছেদের দাবীর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রশাসন চাইলে যেকোন সময় ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করতে পারে। কিন্তু তাদের পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করলে উপরন্তু ক্রাইম আরো বেড়ে যাবে। বাঁচার তাগিদে তাদের নানা অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু হকারদের পুনর্বাসনের ইচ্ছে পোষণের মাস খানেকের মধ্যেই গত ১৬ নভেম্বর খোদ মেয়র আইভী নিজেই ফুটপাতে গিয়ে হকার উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেন। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের দ্বারা ছিনিয়ে নিয়ে আসেন বিভিন্ন মার্কেটের মধ্যে রাখা হকারদের মালামাল। যা পরবর্তীতে নগর ভবনে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here