নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ ও ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নারায়ণগঞ্জের নেতাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত দ্বন্দের মাত্রা বেড়েই চলেছে। যার ফলে কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করলেও দলের পরিবর্তে নেতাদের অনুগামী হয়ে পড়ায় তারাও এখন বিভক্ত হয়ে পড়ছেন।
তবে নারায়ণগঞ্জে এখনও ঐক্যবদ্ধ আছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। বিগত ২০১৪ সালে জুনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের তৎকালীন সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর দলীয় কার্যালয় হারিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে পড়লেও নাসিম ওসমানের অনুজ নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম সেলিম ওসমান এবং জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ লিয়াকত হোসেন খোকার বলিষ্ঠ ভূমিকায় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এখনো আছেন ঐক্যবদ্ধ।

কিন্তু আওয়ামীলীগ ও বিএনপির এমপিসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা মুখে ঐক্যবদ্ধ থাকার দাবী করলেও বাস্তবে তাদের কারনেই অনুগামী নেতাকর্মীরা হয়ে পড়ছে বিভক্ত বলে অভিযোগ করেন তৃণমূলের নেতৃবন্দরা।

কারন হিসেবে তারা বলেন, ‘দলীয় এমপি থেকে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দরা যারা মুখে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাচ্ছেন, খোদ তারাই নানা কারনে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ছেন। আর এর প্রভাব পড়ছে তৃণমূলের উপর।’

তাই দলীয় অনুগামী নেতাকর্মীদের আগে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানানোর পূর্বে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ার পরামর্শ দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

জানাগেছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগে মহানগর আওয়ামীলীগের কার্যকরী সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমানের সাথে বিরোধ চলে আসছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর মাঝে। গত বছর অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনের পূর্বে খোদ দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা উভয়কেই গণভবনে তলব করে মিলিয়ে দিলেও বাস্তবে এখনো পর্যন্ত উভয়ের মাঝে ঐক্য হওয়ার কোন লক্ষ পরিলক্ষিত হয়নি।

সর্বশেষ গত মাসের ১২ আগষ্ট নগরীতে অনুষ্ঠিত শোক দিবসের সর্ববৃৃহৎ র‌্যালীতে মেয়র আইভীর উপস্থিতির মাধ্যমে শামীম ওসমান নিজেদের মধ্যে কোন দ্বন্দ না থাকার প্রমাণ দেখিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিলেও শেষতক আইভীর অনুপস্থিতিতে তা আর সম্ভব হয়নি। ফলে আইভী ও শামীম ওসমানের মাঝে যে দীর্ঘ বছরের দ্বন্দ চলে আসছিল তা নেতাকর্মীদের মাঝে আরো স্পষ্ট হয়ে যায়।

গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের নির্বাচনে তৎকালীন প্রশাসক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাইয়ের পরিবর্তে দল মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেনকে মনোনয়ন দেয়ার পর থেকেই উভয়ের মাঝে মনস্তাত্বিক দ্বন্দের সূত্রপাত ঘটে।

এরপর দলীয় ‘সাংগঠনিক’ সীমানা নির্ধারন নিয়েও জেলা আওয়ামীলীগের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা। যদিও পরবর্তীতে গত ৩০ জুলাই জেলা আওয়ামীলীগের দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধনীতে নারায়ণগঞ্জে এসে সাংগঠনিক সীমানা বিরোধের নিষ্পত্তি করে দিয়ে যান কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ঢাকা বিভাগীয় যুগ্ম সম্পাদক ডা: দিপুমনি এমপি। কিন্তু তারপরেও জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের মাঝে গড়ে উঠেনি একতা।

তন্মধ্যে একটি লিফলেট বিলি করাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদলের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা। তবে এই ঘটনায় শামীম ওসমানের মধ্যস্থতায় বাদল ও খোকনের মধ্যে প্রকাশ্য ঐক্য হলেও বাস্তবে তা দেখতে পায়নি নেতাকর্মীরা।

সর্বশেষ গত জুলাই মাসে মহানগর যুব মহিলালীগের একটি পাল্টা কমিটি অনুমোদন কে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের সাথে সরাসরি বিরোধে জড়িয়ে পড়েন মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা ও সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা। যা নিয়ে এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের নেতারা।

এছাড়াও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ বলয় গড়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই রূপগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ গোলাম দস্তগীর বীর প্রতিকের সাথে আওয়ামীলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক ওরফে আন্ডা রফিক, নারায়ণগঞ্জ-২ আসন আড়াইহাজারে বর্তমান সাংসদ আলহাজ¦ নজরুল ইসলাম বাবু, সোনারগাঁয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক এমপি কায়সার হাসনাত নৌকা প্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক কালামের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানাযায়।

অপরদিকে, কম যায় না বহুবছর যাবত ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিও। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে জেলা ও মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি গঠনের পর থেকেই দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ আরো চরম আকারে ধারন করেছে।

প্রত্যাশা থাকলেও জেলা বিএনপির নেতৃত্বে আসতে না পারার ক্ষোভে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এড. তৈমূর আলম খন্দকার, কেন্দ্রীয় বিএনপির কার্যকরী সদস্য ও সাবেক এমপি আলহাজ¦ গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ, কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মনিরুল আলম সেন্টু জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জমান, সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদের ঘোর বিরোধীতা করেন। এমনকি তারা দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে আগত কেন্দ্রীয় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে বর্তমান জেলা বিএনপির অযোগ্য কমিটি বিলুপ্ত করার দাবী তুলেন।

এছাড়াও একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটিতে নেতায় নেতায় দ্বন্দের মাত্রা আরো বেশী বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়ায় মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি এড. সাখাওয়াত হোসেন খান, মহানগর যুবদলের আহবায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি এড. আবুল কালাম। আর এক্ষেত্রে তিনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু ওরফে পাকনা টিপুকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) সাবেক এমপি আলহাজ¦ গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদের সাথে জেলা বিএনপির শিল্পপতি সহ-সভাপতি শাহ আলমের সাথে দীর্ঘদিন যাবত দ্বন্দ চলে আসছে। সম্প্রতি ফতুল্লা থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মনিরুল আলম সেন্টুও গিয়াসের সাথে যোগ দিয়ে শাহ আলমের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন সোনারগাঁয়েও বিএনপির সাবেক এমপি অধ্যাপক রেজাউল করিম ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নানের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে (আড়াইহাজার) কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান খসরু, আতাউর রহমান আঙ্গুর এবং কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা আজাদের সাথে দ্বন্দ চলছে।

আর নারায়ণগঞ্জ-১ আসন রূপগঞ্জেও এড. তৈমূর আলম খন্দকার, কাজী মনিরুজ্জামান ও দিপু ভূইয়ার মধ্যে বিরোধের কারনে স্থানীয় নেতাকর্মীরাও তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

যার ফলে সম্প্রতি একটি সভায় আওয়ামীলীগের সাংসদ আলহাজ¦ শামীম ওসমান এবং বিএনপির সদস্য সংগ্রহ অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি এড. সাখাওয়াত হোসেন খান বলতে বাধ্য হন, ‘আমাদের দলের কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেও নেতায় নেতায় দ্বন্দ রয়েছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here