নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: সীমানা সংক্রান্ত মামলা জটিলতার কারনে প্রায় দেড় বছর যাবত নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা এবং দীর্ঘ দুই যুগ যাবত স্থগিত হয়ে আছে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন।
আর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আপিল না করায় বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে স্থানীয় সরকার বিভাগের এই দু’টি প্রতিষ্ঠান।

ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েও সদর উপজেলা পরিষদ বেদখল করে রেখেছেন চেয়ারম্যান এড. আবুল কালাম আজাদ বিশ^াস। আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন দ্বারা পরিচালিত ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে পড়েছে ভারাক্রান্ত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনগণ।

তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের স্বদিচ্ছা থাকলে অনেক আগেই সদর উপজেলা ও ফতুল্লা ইউনিয়ন নিয়ে হাইকোর্টে রীট করা মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যেত। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অনীহার কারনে বছরের পর বছর যাবত ঝুলে রয়েছে এই দু’টি সংস্থার নির্বাচন।

তাই মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ পূর্বক দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা।

জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কি:মি: দূরে দক্ষিণ-পূর্বে ঢাকা শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত। উত্তরে ও পশ্চিমে ঢাকা জেলা, দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জ জেলা ও পূর্বে শীতলক্ষ্যা নদী। পশ্চিম সীমানার কিছু অঞ্চল দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী এবং দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে ধলেশ্বরী নদী প্রবাহিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আয়তন ১০০.৭৪ বর্গ কি:মি:। উপজেলাটি ১ টি সিটি কর্পোরেশন (আংশিক), ৭ টি ইউনিয়ন, ৩ টি থানা, ১৭৮ টি মৌজা, ৩০৫ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। এখানে রয়েছে সদর, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ তিনটি পুলিশ ষ্টেশন। মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৫৯ জন। আর মহিলা ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৬ হাজার ১২৫ জন।

সূত্রমতে জানাগেছে, সর্বশেষ ২০০৯ সালে সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। এরপর ২০১১ সালে সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়।

পরবর্তীতে ফতুল্লা অংশ বাদ দিয়ে উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (২০০৯ সনের ৩০ জুন সংশোধিত) এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার সদর উপজেলা পুনর্গঠন করে ২০১৪ সালের ৪ মার্চ এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে।

কিন্তু কিছু অংশ বাদ দিয়ে উপজেলা গঠন হওয়ায় ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের করা হয়। যার পিটিশন নং- ৩০৮৯।

তারপর ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারী ফতুল্লা এলাকার বাসিন্দা সাহাবদ্দিন গং এর দায়েরকৃত একটি রিট পিটিশনের শুনানী শেষে বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকি ও রাজিক আল জলিলের দ্বৈত বেঞ্চ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ দেন।

কিন্তু গত বছর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান সদর উপজেলা নির্বাচনের স্থগিতাদেশের পক্ষে আদালতে রিটকারীকে মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও ক্ষমতা আকঁড়ে রাখতে রিটকারীকে দিয়ে মামলা প্রত্যাহারে টালবাহানা করছেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এড. আবুল কালাম আজাদ বিশ^াস বলে অভিযোগ করেন রিটকারীর ঘনিষ্টজন।

শুধুু তাই নয়, সীমানা সংক্রান্ত ইস্যুতে সদর উপজেলা নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়েরের নেপথ্যেও চেয়ারম্যান আজাদ বিশ^াসের হাত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

তবে এই সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এড. আবুল কালাম আজাদ বিশ^াস। তার দাবী, তিনিও চান যে উচ্চ আদালত মামলার নিষ্পত্তি করলে দ্রুত যেন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

অপরদিকে, এই মামলা জটিলতায় প্রায় দুই যুগ যাবত নির্বাচনহীন ভাবে পরিচালিত হচ্ছে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ। উক্ত ইউনিয়নের ভোটাররা সর্বশেষ কবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন, সেইদিনটিও ভুলে গেছেন অনেকে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ। এই ইউনিয়নের মধ্যে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার কার্যালয়সহ নারায়ণগঞ্জ আদালত ও জেলা কারাগার রয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সরকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমনকি জেলা পরিষদ, এলজিডিইআর ও উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ও রয়েছে এই ইউনিয়নে।

প্রায় ৩.৬১ বর্গমাইল আয়তনের এই ইউনিয়নের ১০টি মৌজায় ১১টি গ্রামে লোক সংখ্যা রয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৩৩ জন।
শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান পালন, খেলাধুলা সবকিছু মিলিয়ে অত্র ইউনিয়নটি নারায়ণগঞ্জ জেলায় কালের স্বাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরও দীর্ঘ ২ যুগ ধরে নির্বাচন থেকে বঞ্চিত রয়েছে ইউনিয়নবাসী।

সর্বশেষ ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে অদ্যবধি মামলা জটিলতার কারণে প্রায় ২ যুগ ধরে ঝুলে আছে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এতে করে ইউনিয়নবাসী সকল ধরনের সুবিধাসহ নাগরিক অধিকার ভোটদান থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, ১৯৯৬ সালে ফতুল্লা ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান নূর হোসেন ও ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মালেক মিলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পর্দার আড়ালে থেকে তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে হাইকোর্টে পক্ষে বিপক্ষে দু’টি মামলা করান।

যার মধ্যে একটির বাদী ফতুল্লার কুতুবআইল ইরান গার্মেন্ট সংলগ্ন এলাকার মৃত হাসান আলী মাতবরের ছেলে কদর আলী মাতবর ফতুল্লা ইউনিয়নকে পৌরসভা করার দাবী জানিয়ে এবং আরেকটির বাদী একই এলাকার পার্শ্ববর্তী বাড়ির মৃত. সোহরাফ মাতবরের ছেলে হানিফ মাতবর ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ বহাল রাখার দাবী জানিয়ে রিট মামলা করেছিলেন। এতে ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত রাখতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এরপর ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর নূর হোসেন চেয়ারম্যানের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন লুৎফর রহমান। কিন্তু কয়েকবারই মামলার বাদীরা নির্বাচন চালানো নিয়ে আপত্তিসহ মামলা তুলে নেয়ার চেষ্টা করলেও বর্তমান ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন ও ৫নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল মালেক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন।

তিনি বলেন, ‘আদালত মামলার নিষ্পত্তি করলেই তো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তখন জনগণ চাইলে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করবো।’

আর মামলা সংক্রান্ত এব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাচন কমিশনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোনে তাকে সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here