নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি সংসদীয় আসনেই ‘নৌকা’ প্রতীকে প্রার্থী দিতে আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দরা জোর দাবী জানিয়ে আসলেও এবার জাতীয় পার্টিকে হঠানোর পক্ষে এক জোট হচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দরা।

আগামীতে জাতীয় পার্টিকে আর ছাড় না দিতে মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন, সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা ও সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা বিরুদ্ধাচরন করলেও এবার তাদের সাথে সহমত পোষণ করে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নারায়ণগঞ্জে আর ছাড় না দেয়ার অভিমত ব্যক্ত করেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।

গত শনিবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে সোনারগাঁ উপজেলার মঙ্গলেরগাঁও ঈদগাঁহ ময়দানে শহীদ ছাত্র নেতা মিজানুর রহমানের ২৬তম স্মরন সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও মেয়র আইভী বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনই আওয়ামীলীগের ঘাঁটি। সোনারগাঁয়ে জাতীয় পার্টি আর চাই না। নৌকাকে চাই। বালু সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজরা কখনো টিকতে পারবে না। মানুষ শান্তি চায়। মানুষকে ভালবাসতে হবে। শেখ হাসিনার উন্নয়নকে মানুষের দোর গোড়ায় পৌছে দিতে হবে।’

আইভী বলেন, ‘কায়সার হাসনাতের বাবা আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। কায়সার যখন আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছিল তখন মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় আমি এক সভায় তার পক্ষে নৌকায় ভোট চেয়েছিলাম। আজ আবারও তার জন্য ভোট চাইলাম। আগামী সংসদ নির্বাচনে কায়সার মনোনয়ন পেলে আপনারা তাকে ভোট দেবেন।’

জানাগেছে, বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টি বের হয়ে আওয়ামীলীগের বিরোধী হয়ে নির্বাচন করলেও নারায়ণগঞ্জে সবসময়ই জাতীয় পার্টি ও আওয়ামীলীগ একই সূত্রে গাঁথা ছিল।

আওয়ামীলীগের অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আবার জাতীয় পার্টির অনুষ্ঠানে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে অংশ গ্রহণ করতো আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। দেখে যেন কোন বোঝারই উপায় ছিল না যে, নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ, নাকি বিরোধী দল জাতীয় পার্টি।

যার ফলে সদ্য বন্দরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির বর্তমান সাংসদ সেলিম ওসমানের অর্থায়নে প্রয়াত সাবেক এমপি নাসিম ওসমানের নামে নির্মিত নাসিম ওসমান মডেল হাই স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য কালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ বলতে বাধ্য হন, ‘নারায়ণগঞ্জে এসে মনে হচ্ছে এখানে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি বলতে আলাদা কোন দল নেই। নারায়ণগঞ্জে শুধু ওসমান লীগ ও ওসমান পার্টি।’

এমনকি গত ১২ আগষ্ট নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামীলীগের সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমানের আয়োজনে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের সর্ববৃহৎ শোক র‌্যালীতেও আওয়ামীলীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরাও যোগ দিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আগামী ১৫ আগষ্ট বন্দর সমরক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসূচীর আয়োজন করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সেলিম ওসমান এবং সোনারগাঁয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ¦ লিয়াকত হোসেন খোকা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রীয় কাগজে কলমে বর্তমানে আওয়ামীলীগ ক্ষমতাসীন দল ও জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হলেও নারায়ণগঞ্জে দু’টি দলের নেতাকর্মীরাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে পরষ্পরের সাথে সৌহার্দ্য পূর্ণ আচরন করাসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছেন।

যার নেপথ্যে রয়েছেন একই পরিবারে থাকা দু’টি দলের সাংসদ ভ্রাতৃদ্বয় থাকার কারনে।

কিন্তু আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন দু’টি দলে চরম ফাটল ধরতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণের প্রস্তুতি নেয়ায় কেন্দ্রীয় ভাবে আওয়ামীলীগ জাতীয় পার্টি যেখানে ফের জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে সেখানে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টিকে কোন আসন ছাড় না দেয়ার লক্ষ্যে এখন (তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইছেন/ তাদের রাজনীতির মাঠে ‘শত্রু’ ভাবতে শুরু করেছেন/ তাদের ‘মুখোমুখি’ অবস্থানে দাঁড়াতে চাচ্ছেন) ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দরা।

আর কয়েকমাস পূর্বে কাঁচপুরে আওয়ামীলীগের সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাতের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর উপস্থিতিতে আগামীতে সোনারগাঁসহ নারায়ণগঞ্জে কোন আসন জাতীয় পার্টিকে ছাড় না দেয়ার সর্বপ্রথম দাবী তুলেছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই।

গত ৩০ জুলাই শহরের ২নং রেলগেটস্থ আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে জেলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ঢাকা বিভাগীয় যুগ্ম সম্পাদক ডা: দিপু মনি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিষ্টার মহিবুল আলম চৌধুরী নওফেলের কাছেও আগামী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে ৫টি আসনে নৌকার প্রার্থী দিতে জোড়ালো দাবী জানিয়েছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই, সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদল, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীসহ শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দরা।

তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে নৌকার প্রার্থী দেয়ার লক্ষ্যে জেলা আওয়ামীলীগ ‘শালীনতা’ বজায় রেখে দাবী করলেও একই দাবীতে মহানগর আওয়ামীলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দদের বক্তব্য গুলো শুনে মনে হচ্ছে ‘আক্রমনাত্মক’ বক্তব্য দিয়ে জাতীয় পার্টির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন/ মুখোমুখি অবস্থানে/ জাতীয় পার্টিকে শত্রু হিসেবে মনে করছে তারা।

কারন সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনটি আগামীতে জাতীয় পার্টিকে ছ্ড়া দেয়া, না দেয়া নিয়ে কড়া ভাষায় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন ও সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা। যাদের সাথে সদ্য যোগ হয়েছেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা।

গত ১৩ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে মহানগরের টানবাজার ১৫ নং ওয়ার্ডে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি বক্তব্যে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন স্থানীয় জাতীয় পার্টি ও এমপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আওয়ামীলীগের ভেতরে ঢুকে কোন একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হোক সেটা আমারা চাই না। আওয়ামীলীগ করতে চাই আওয়ামীলীগের ভেতর। কিন্তু আজকে আওয়ামীলীগের ভেতর ঢুকে জাতীয় পার্টিকে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চলছে। যা আগামীতে হতে দেয়া যাবে না।’

একই অনুষ্ঠানে মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, ‘আমারা চাই আনোয়ার ভাই চায় এই আসন (নারায়ণগঞ্জ-৫) থেকে নৌকার প্রার্থী আসুক। অন্য কোন প্রার্থী এমপি হয়ে আসলে অনেক সমস্যা হয়। যেমন আওয়ামীলীগের কেউ স্কুল কমিটিতে আসতে পারেনা, মসজিদ কমিটিতে আসতে পারে না।’

‘অথচ, আমি বন্দরে দেখলাম বিএনপির লোক স্কুল কমিটিতে আছে। কিন্তু সেই পোড় খাওয়া আওয়ামীলীগের লোক যার একসময় সাধনা ছিল স্কুল কমিটিতে আসার, সে আসতে পারে নাই, সে কিন্তু হতে পারে নাই। এতে আসলে আমি কিছু মনে করি না।’

কারণ হিসেবে খোকন সাহা বলেন, ‘এই আসনে যিনি সংসদ সদস্য তিনি আমদের দলের লোক না। একটা দল থেকে প্রার্থী করা হয়েছিল। জোট করা হয়েছিল, মহাজোটের পক্ষ থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। নির্বাচন ইস্যুতে জোট হয়েছিল, এটি আদর্শের জোট নয়। আগামীতে আমরা চাইবো নারায়ণগঞ্জের সব আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী দেয়া হোক, এটা নেত্রীর কাছে চাইবো। আমরা জাতীয় পার্টির প্রার্থী দেখতে চাইনা, আওয়ামীলীগের প্রার্থী দেখতে চাই।’

আর তাদের নতুন করে যোগ হওয়া মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা জাতীয় পার্টিকে চরম ভাবে কটাক্ষ করে বলেন, ‘জাতীয় পার্টিও একটি পাির্ট, তেলাপোকাও একটি পাখি’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here