নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: বলা হয়ে থাকে, শিল্প বাণিজ্যে সমৃদ্ধ জেলা হচ্ছে প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ। গার্মেন্ট, কল-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই শ্রমিকদের ঘামের বিনিময়ে আজ অর্থনৈতিক উন্নতির শিখরে উঠতে সক্ষম হচ্ছে মালিকরা।
তবে এই জেলায় শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে যেমন, তেমনি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের দাবী আদায়ে আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে নামতে বাধ্য হচ্ছে শ্রমিকগণ। আর সেই দাবী আদায়ে কখনো সফল হচ্ছেন তারা, কখনো বা দাবী আদায় হলেও হতে হচ্ছে তাদের চাকুরীচ্যুত।

কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের নেপথ্যে থেকে যারা কলকাঠি নাড়েন, সেই সকল নেতারা বরাবরই হচ্ছেন লাভবান। আরাম আয়েশে দিন কাটালেও শ্রমিক কিংবা মালিকপক্ষ, উভয়ের কাছেই নেতারা বনে যান ভগবান।

কারন, শ্রমিকরা দাবী আদায়ে আন্দোলন করলেও নেতাদের সাথেই সমাঝোতা করে থাকেন মালিকরা। ফলে শ্রমিকরা নিপীড়িত, শোষিত হয়ে সাময়িক লাভবান হলেও মালিকপক্ষের কাছে সর্বদা মূল্যায়িত হন শ্রমিক নেতারা বলে দাবী করেন, শ্রমিকদের স্বার্থ আদায়ে কাজ করে যাওয়া বিভিন্ন এনজিও সংস্থার নেতৃবৃন্দরা।

তবে কি সত্যিই মেহনতি শ্রমিকদের আন্দোলনের নেপথ্যে থেকে লাভবান হন নেতারা- এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রম কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ¦ কাউসার আহম্মেদ পলাশ শ্রমিক নেতাদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন দাবী করে নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডিকে বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলে নেতারা নয়, বরং শ্রমিকরাই আন্দোলন সংগ্রাম করে লাভবান হয়েছে। এই শেখ হাসিনার আমলে শ্রমিকদের নিয়োগ পত্র পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদানসহ শ্রমিকদের মেধাবী সন্তানদের সহযোগিতায় গঠন করা হয়েছে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন।’

তাহলে সমালোচকরাই বলুক ‘আন্দোলনে লাভবান কারা, শ্রমিক নাকি নেতারা’ বলে প্রশ্ন তুলেন পলাশ।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, ‘শ্রমিকরা আমাদের দেশের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, শ্রম আইন বাস্তবায়নে আন্দোলন করে আসছি। বিশেষ করে ২০০৩ সালে ৮ ঘন্টা শ্রমিক মজুরীর দাবীতে আন্দোলন করে আসছি। যারা ব্যাক্তি স্বাথে শ্রমিকের সংগঠন করে তারা প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের নেতা না। এরা ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ার। ফলে তাদের সাথে তুলনা করা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আমরা আন্দোলন করি শ্রমিকদের স্বার্থে। লাভবানও হয় তারা।’

মহানগর শ্রমিকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাইলপট্টী লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, ‘আমরা পারিবারিক ভাবেই আল্লাহর রহমতে সামর্থ্যবান। সুতরাং শ্রমিকদের নেতা সেজে অর্থকড়ি কামানোর কোন স্বদিচ্ছা আমাদের নাই। আমি শ্রমিকদের স্বার্থ আদায়ে কাজ করে থাকি। মালিকরা যেন কোনক্রমেই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বঞ্চিত করতে না পারে, সেজন্য কখনো মালিকদের সাথেও কঠোর ব্যবহার করি। কারন, শ্রমিক বাঁচলে, মালিক বাঁচবে। আর মালিক বাঁচলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিও হবে।’

উল্লেখ্য, আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালে আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে প্রতি বছর পালিত হয় এই দিবস। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবীতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়।

১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।

এর পরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবী আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পহেলা মে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহবান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না থাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে’র ১ তারিখে “বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার” সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তারপর থেকেই প্রতি বছর ১ মে সারা বিশে^র ন্যায় বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উদযাপিত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here