নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। বিগত ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বারের মত অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে নগরমাতা নির্বাচিত হয়ে ২৭ টি ওয়ার্ডে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত ৩৬ জন নারী-পুরুষ কাউন্সিলর নিয়ে নগরোন্নয়ণের যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি।
যার ফলে উন্নয়ণের স্বার্থে বারংবার আহবান জানানো স্বত্তেও সিটি কর্পোরেশনের ২৭ টি ওয়ার্ডের আওতাধীন সংসদীয় দু’টি আসনের প্রভাবশালী দুই সাংসদ ভ্রাতৃদ্বয় নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের জাতীয় পার্টির এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ এ কে এম সেলিম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের আওয়ামীলীগের এমপি আলহাজ¦ এ কে এম শামীম ওসমানকে কখনো তোয়াক্কাই করেনি ক্ষমতার মোহে থাকা দাম্ভিকরূপী প্রভাবশালী সিটি মেয়র নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।

বিগত ২০১১ সালে সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামীলীগের সমর্থণে শামীম ওসমান মেয়র প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই তাদের পরিবারের সাথে আইভীর শত্রুতার সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটলেও ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সব ভেদাভেদ ভুলে তখন আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী এই আইভীর পক্ষেই নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছিলেন শামীশ ওসমান।

এমনকি ছোট বোন আইভীর রাগ অভিমান ভাঙ্গাতে তখন তাঁর জন্য নৌকা প্রতীক সম্বলিত দু’টি শাড়ী উপহার পাঠানোর পাশাপাশি নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করেই নৌকা প্রতীকে ব্যালট পেপারে প্রকাশে সীল মেরে সমালোচিত হয়েছিলেন শামীম ওসমান।

কিন্তু তারপরেও আইভীর মান ভাঙ্গাতে পারেননি শামীম ওসমান। উপরন্তু, গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিজের একমাত্র পুত্র সন্তান অয়ন ওসমানের বিবাহের নিমন্ত্রণ পত্র নিয়ে আইভীর বাড়ীতে গেলেও প্রায় ঘন্টাব্যাপী অপেক্ষা শেষে আইভীর সাক্ষাত না পেয়ে কার্ড দিয়ে শামীম ওসমান ফিরে আসার পর সেই বিয়েতে আইভীর পরিবার যোগদান না করলেও চলতি বছরের জানুয়ারীতে সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অয়ন ওসমানের বিয়ের খরচ নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে আইভী শামীম ওসমানকে ক্ষেপিয়ে তুলেন।

এরপরেও বড় ভাই হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান আইভী ও শামীম ওসমানের সম্পর্কে জোড়া লাগাতে চালিয়েছিলেন নানা প্রয়াস। অনেকটা বিনা আমন্ত্রণেই গত বছরের জুলাইতে নগর ভবনে অনুষ্ঠিত নাসিকের বাজেট অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সেলিম ওসমান ছোট বোন আইভীর মাথায় হাত বুলিয়ে অভিমান ভুলে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে এসেছিলেন। এমনকি গত একযুগেও যে কাজ সিটি কর্পোরেশন করতে পারেনি, সেদিন আইভীর দাবীর প্রেক্ষিতে নিতাইগঞ্জের সেই অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ডটিও তাৎক্ষনিক উচ্ছেদের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সেলিম ওসমান।

পরবর্তীতে নিজেদের সংসদীয় আসন সিটি কর্পোরেশন এলাকাভুক্ত হওয়ায় শুধুমাত্র উন্নয়ণের স্বার্থে ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে সেলিম ওসমান বরাবরই আইভীকে একত্রে আলোচনার টেবিলে বসতে জানিয়ে এসেছিলেন আহ্বান। সর্বশেষ গত জুন মাসে সেলিম ওসমান নাসিকের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে আইভীকে শেষবারের মত আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানান সেলিম ওসমান। কিন্তু তাতেও আইভী কোন সাড়া না দেয়ায় নিজেদের এলাকার উন্নয়ণের স্বার্থে দলমতের উর্ধ্বে থাকা এমপি সেলিম ওসমানের পানে একে একে ভীড়তে থাকেন আইভী বলয়ে থাকা আওয়ামীলীগ ও বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলররা।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন ৯টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মধ্যে আগে থেকেই ৭/৮ জন শামীম ওসমানের বলয়ে থাকলেও আইভী পন্থী বেশীর ভাগ কাউন্সিলরই মাস খানেক পূর্বে সেলিম ওসমানের বলয়ে চলে যান। যার মধ্যে, বন্দরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলরই বেশী। আর সর্বশেষ গত ৩ ডিসেম্বর আইভীর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসাইনও সেলিম ওসমানের বলয়ে উন্নয়ণের স্বার্থে চলে যান।

খোদ এই জনপ্রতিনিধিদেরই পরিসংখ্যান মতে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের ২৭ জন পুরুষ ও সংরক্ষিত ৯টি ওয়ার্ডের ৯ জন নারী কাউন্সিলরের মধ্যে বর্তমানে ওসমান বলয়ে চলে এসেছেন ৩০ জন কাউন্সিলর।

ফলে আইভীর বলয়ে এখন কাউন্সিলর আছেন মাত্র ৫ জন। এরা হলেন, প্যানেল মেয়র-১ আফসানা আফরোজ বিভা, প্যানেল মেয়র-৩ মিনোয়ারা বেগম, নারায়ণগঞ্জ-২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন, ৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জি এম সাদরিল, ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরন বিশ^াস।

তন্মধ্যে, কাউন্সিলর খোরশেদ ও অসিত বরনকেও সেলিম ওসমান গত ৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একটি মতবিনিময় সভায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে আইভী অত্যন্ত আস্থাভাজন এই দুই কাউন্সিলর অনুপস্থিত থাকলেও সেলিম ওসমান ভবিষ্যতে তাদের উপস্থিতির প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন।

তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন, আইভীকে ঘায়েল করতে মেজরিটি সংখ্যক কাউন্সিলর নিজেদের বলয়ে ভীড়ানোটাই ছিল মুখ্যম কৌশল। যা কিনা করতে দেরীতে হলেও সক্ষম হয়েছেন ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here