রনজিৎ মোদক : বারো মাস তেরো পার্বণের দেশ এই বাংলাদেশ। এদেশের মাটি আর মানুষের মন এক সূত্রে গাঁথা । হাজার বছরের পুরানো আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে প্রেম আর ভক্তি রসে ধারা। স্মরণাতীত কাল হতে সনাতন আর্যধর্মের সাধনা ও আচানুষ্ঠান বিভিন্ন ধ্ারায় প্রবাহিত। তন্মধ্যে শাক্ত আর বৈষ্ণব ধারা দু‘টি পৃথক হলেও উদ্দেশ্যে মূলত এক। বেদের যেমন দুইটি ধারা একটি কর্মকান্ড অপরটি জ্ঞান কান্ড। কর্ম এবং জ্ঞান দ্বারাই ঈশ্বর কে লাভ করা যায়। জ্ঞানই ঈশ্বর । বেদের একটি ধারা বিবিধ উপনিষেধ ,যজ্ঞকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। মানব দেহকে অবলম্বন করে যোগশাস্ত্র উদ্ভু¿ত তা সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায় কে প্রভাবিত কে রছে।

বেদের ব্রক্ষকেই তন্ত্রশাস্ত্রে ব্রক্ষ¥ময়ী মহা শক্তি রূপে বনর্না করা হয়েছে। যিনি সৃষ্টির ,স্থিতি,প্রলয়য়ের কর্তা তিনিই শক্তি রূপাই চন্ডী । যে শক্তি জীবের অন্তরের শক্তিকে জাগ্রত করে তিনিই চন্ডী। আর সেই শক্তিই যখন জীবের দূগর্তি নাশ করেন তিনিই দুর্গা । চন্ডী মার্কেন্ডে পুরানেরঅর্ন্তগত। এতে সাতশ শ্লোক রয়েছে তাই একে সপ্তসতী নামে অভিহিত করা হয়েছে । শ্রী শ্রী চন্ডী আত্মার জাগ্রত করার দিক নির্নয় করা হয়েছে ।পথ না হাটলে পথ ফুরায়না । সেই সাধনা না করলে সিদ্ধি লাভ করা সম্ভব হয়না । দুঃখ, দারিদ্র্য,শোক, বেদনাময় পৃথিবীতে মুলতঃ কেউ সুখি নয়। সুখ নামের কল্পিত পাখির পিছে আমরা সবাই দৌঁড়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সুখ কোথায় ? মেধামুনি রাজ্যভ্রষ্ট-বিষাদগ্রস্থ মহারাজ সুরথ ও স্বজন কর্তৃক বিতাড়িত সমাধি নামক বৈশ্যকে মহা শক্তি সাধনা পথের মাধ্যমে যথাক্রমে স্বাধিকার ও মুক্তি লাভের উপায় নিদের্শ দেন। স্মরণাগত শিষ্য তত্ত্ব জিজ্ঞাসু ভক্ত মহারাজ সুরথ ও বৈশ্য সমাধির নিকট মেধামুনি দেবাসুর সংগ্রামে বার বার পরাজিত দেবগণ কিরূপে আত্ম শক্তির উদ্ধোধন ও বিকাশ সাধন করে পরিণামে নিজেদের স্বাধীকার পুনরুদ্ধার করেছিলেন তা বর্ননা করেছেন। সুরথ রাজা লক্ষ বলী দিয়ে সিদ্ধিলাভ করেন। মানব হৃদয় লাখ লাখ ফনায় চারদিক বিস্তারিত হচ্ছে। কিন্তু লক্ষস্থির না হওয়ায় সিদ্ধিলাভ হচ্ছে না। কোন কর্মের সিদ্ধিলাভ করতে হলে ,প্রথম ধাপে লক্ষস্থির করতে হবে ।লক্ষস্থির করে সিদ্ধি লাভের প্রত্যাশায় সাধনা করা চাই ।

সমস্ত তন্ত্রের সার চন্ডীর মূল বেদে প্রতিষ্ঠিত । প্রথম চরিত্র ঋগে¦দ,স¦রূপাএবং উত্তর চরিত্র সামবেদ স্বরূপা । চন্ডী গ্রন্থ তিন ভাগে বিভক্ত । প্রথম ভাগে দেবী মহাত্ম্যের সূচনা ,দ্বিতীয় ভাগে মূলগ্রন্থ তৃতীয় ভাগে রহস্যময়। পরাত্মাকে নানান রূপে,নানাভাবে বর্ণনা হয়েছে। সাধনার পথে বিঘœ বিপদ দূরীভূত করার জন্য মনঅন্তঃ অন্তঃমুখী মাতৃমুখী করে অভীষ্ট পথে অগ্রসর হতে হয়। নচেৎ মনের মাঝে মায়া প্রভাবে জ্ঞান শক্তি তার মায়া প্রভাবে জ্ঞান শক্তিকে আবৃত্ত করে রাখে। মেঘের আড়ালে সূর্য আবৃত হলে পৃথিবী অন্ধকারময় হয়। অজ্ঞানতার অন্ধকার মানুষ যখন আবৃত ,তখন সে সমস্ত কিছুই অন্ধকার অনুভব করে। চন্ডী হচ্ছে শক্তিরূপা । জ্ঞান রুপে হৃদয় হৃদয় অবস্থান করেন ।

চন্ডীর উৎপত্তি সম্বন্ধে নানান মত প্রচলিত । কোন কোন পন্ডিতগনের মতে,নর্মদা অঞ্চলে বা উজ্জয়িণীতে শ্রীশ্রী চন্ডী রচিত। কিন্তু পন্ডিত দক্ষিনারঞ্জন শাস্ত্রী ঐতিহাসিক যুক্তি সহকারে উক্ত মত খন্ডন করেন। তিনি প্রমান করেছেন যে, সম্ভবত: বাংলাদেশেই চন্ডীর জন্মস্থান। স্বামী বিবেকানন্দ প্রথমে নর্মদা তীরে মহামায়া চন্ডীর সাধনা করতেন। তিনি চন্ডীর উৎপত্তির স্থান সমন্ধে চিন্তা করতে করতে তন্ময় হয়ে মহামায়া মায়ের প্রতি অভিমান বশত নর্মদার জলে প্রাণ ত্যাগের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দিতে গেলে দেবী দৈববাণী করলেন,“ তুমি বাংলার পূর্ব প্রান্তে চন্দ্রনাথ তীর্থে গিয়ে তার দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত নাভিগংগা আবিস্কার কর, ঐ স্থানেই আমার আর্বিভাব হয়েছিলো।” এদিক দিয়ে ইতিহাসের পাতা ও ভৌগোলিক স্থান লক্ষ করলে দেখা যায় চট্রোগ্রাম শহর হতে এগারো মাইল দূরে করলাডাঙ্গর পাহাড়ে অবস্থিত মেধা আশ্রম।এখানে বর্তমানেও একটি ক্ষীনকায়া পার্বত্য জলধারা প্রবাহিত।এর পাশেই মেধামুনির পদচিহ্ন নামে একটি পায়ের দাগ রয়েছে।

জগত সৃষ্টি লগ্নে ব্রক্ষ্রা মধু কৈটব দুই দ্বৈতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার লক্ষে স্বয়ং বিষ্ণুর যোগ নিদ্রা ভঙ্গ করেন। তখন ব্রক্ষ¥ যোগমায়ার স্তব করেন। কৃত্তিবাস কৃত বাংলা রামায়ণে রামচন্দ্র ত্রেতা যুগে রাবন বধের জন্যে অকাল বোধন করেন। মশরৎকালে এ পূজা করা হয় । বসন্তকালে বাসন্তি পুজা করার নিয়ম রয়েছে। শ্রী চন্ডীর দ্বাদশ অধ্যায়ে ভগবতী বাক্যে উভয় পূজার বিধান রয়েছে। মহাভারতেও দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দুর্গার (চন্ডীর) প্রার্থনা করার উপদেশ দিয়েছিলেন । পদ্ম পুরনে শ্রী চন্ডীর কাহিনী রয়েছে। সতীরূপে চন্ডীর দেহত্যাগ সে এক অপূর্ব কাহিনী। সতীর দেহ বায়ান্ন খন্ডে খন্ডিত করার পর তা বায়ান্ন তীর্থ ক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে।

আদিকাল থেকেই ভারত বর্ষে শক্তি সাধনার ধারা চলে আসছে । ভারতবর্ষের বাহিরেও তিব্বত ,কাতার, চীন,জাভা,ব্রক্ষ্মদেশ জাপান এমনকি বৌদ্ধ ধর্মেও শক্তি পূজা অনুপ্রবেশ করেছিল। মাতৃভাবের সাধক রাম প্রসাদ,রাজা রামকৃষ্ণ ,বামাক্ষেপা, শর্বানন্দ ঠাকুর,সাধুতার চরণ,শ্রী শ্রী লোকনাথ ও ঠাকুর রাম কৃষ্ণ দেব এই শক্তিরূপাকে লাভ করেছিল্ ো। ঠাকুর রাম কৃষ্ণদেব বলতেন, তিনি উপনিষদের পরব্রক্ষ¥ তিনিই তন্ত্রের মহামায়া । রাম প্রসাদ গেয়ে উঠলেন, কালীব্রক্ষ্ম জেনে মর্ম ধর্মাধর্ম সব ছেড়েছি। গীতায় শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন “ পিতা হমস্য জগতোধাতা মাতা,পিতামহঃ । কলিযুগে বৈষ্ণব অবতার শ্রী চৈতন্য ভাগবতে ভগবতীর কথা উল্লেখ করেছেন। শ্রী শ্রী চন্ডী তত্ত্বে প্রবেশ করতে হলে, বর্তমান যুগে বহু মনষী ও সাধকদের বিভিন্ন গ্রন্থ প্রনিধান যোগ্য।বঙ্কিম চন্দ্রের কমলা কান্তের দুর্গোৎসব ,নবীন চন্দ্রের ,চন্ডীর ব্যাখ্যা ,সত্যদেবের ‘সাধন সমর’ বিজয় কৃষ্ণের ‘মা আমার কালো কেন’ কাজী নজরুল ইসলামের ‘শ্যামা সঙ্গীত’ স্বামী বিবেকানন্দের ‘কালী দি মাদার’ অদ্বৈতানন্দের ‘দশমহা বিদ্যা’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য । আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধে মানুষের মাঝে অন্তরগত দু‘টি রূপের কথা উল্লেখ করেছেন। পুরুষের মাঝে ¯েœহ মায়া মমতা মাতৃ হৃদয়ের চিত্রকে তুলে ধরেছেন্ ।

নারী জাতিতে ¯্রষ্টারসৃষ্টি শক্তির কেন্দ্রভূত রয়েছ্ ে। মাতৃ রূপে ঈশ্বরকে সাধনা সহজ। মায়ের কাছে সন্তানের লক্ষ দাবী ¯েœহময়ী জননী সন্তানের বহু গঞ্জনা সহ্য করেও অসহায় সন্তানকে মমতায় কোলে তুলে সোহাগে জড়িয়ে ধরেন। ¯্রষ্টা তার সৃষ্টির মাঝে নিবির সম্পর্ক অনুভব করার জন্যেই শ্রী চন্ডীতে মাতৃরূপা ঈশ্বরীর বন্ধনা করা হয়েছে। কুমারী পূজা তার এক জ্বলন্ত প্রমান। মহামায়া যোগেরশ্বরী যোগ মায়া বিশ্ব ব্যাপীনি হলেও নারী মূর্তিতে তার প্রকাশ । পূরানে বলা হয়েছে, সৃষ্টির আদিতে পরম পুরুষ নিজের লীলা বিস্তার করার জন্য নিজকে নারী ও পুরুষ দু‘ভাগে ভাগ করেছিলেন । জগত মাতাকে আমরা শুধু মাতৃভাবে নয়, কণ্যা ভাবেও বরন করি। দেবতাদের তেজ থেকে মহামায়ার সৃষ্টি। দেবতাদের মঙ্গলের জন্য তিনি মহিষাসুর কে বধ করেছিলেন । অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করে শুভ শক্তির জয় হয়্। মহিষাসুর অশুভ শক্তির প্রতীক । তমগুনের অধিকারী । মানুষের মাঝে যতক্ষন পর্যন্ত তমগুন বিরাজ করবে ততক্ষন পর্যন্ত মুক্তি বা মঙ্গল কামনা করা বৃথা।

ভারতবর্ষে বর্ণে বর্ণে গোত্রে গোত্রে হিংসা যুদ্ধ হত্যা চলছিল । কিছুতেই সে হিংসার আগুন নেভানো সম্ভব নয়্ । তাই সেই সময় রাজা কংশ নারায়ণ তার রাজ্যে সকল সম্প্রদায়কে নিয়ে মহা মঙ্গল কামনায় দুর্গা পূজা করেছিলেন। সেই থেকেই ভারতবর্ষে দুের্গাৎসব শুরু হয়। নিষ্ঠাবান হিন্দু আজও প্রতিদিন শ্রীশ্রী চন্ডী গ্রন্থ পাঠ করেন। বাংলা বাঙ্গালী ঘরের কণ্যা যেমন তার স্বামীর গৃহ থেকে পিত্রালয়ে মাত্র কয়েক দিনের জন্যে নায়র আসে , ঠিক তেমনি দুর্গা আসেন তাঁর সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি বেড়াতে। চন্ডীর মধ্যে রুপকের সাহায্যে গভীর আধ্যাতি¦ক তত্ত্ব বর্ণিত । তা অনুসরন করাই আমাদের কর্তব্য । মানুষের হৃদয়ের মাঝে সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তির যুদ্ধ সর্বদাই চলছে। মহা শক্তি জ্ঞানময়ী দুর্গার স্মরণ নিলে আমাদের সৎ প্রবৃত্তিগুলো জেগে উঠে। প্রকৃতপক্ষে এ হচ্ছে সাধন সমর । মানুষের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহকে কুল কুন্ডলিনী শক্তির সাহায্যে জয় করতে হয়। কামনা বাসনার উপর থেকেই সম্পূর্ন বিরক্ত না হলে, মহামুক্তির সন্ধান মিলে না । আজ পূজার পরিবর্তে উৎসবটাই বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মহামুক্তির প্রত্যাশায় দুর্গা পূজার মহা আয়োজন। তাই দুর্গা পূজা বাংঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতীয় উৎসব ।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here