বিশেষ প্রতিবেদক: কোন স্বার্থ নয়, শুধুমাত্র মানবতার টানে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই করোনা মহামারীতে সাধারণ মানুষের সেবায় দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি লিটন চন্দ্র পাল। একই সাথে যিনি রোটারি ক্লাব অব রাজধানী সোনারগাঁ এর সভাপতি এবং সারদা অঞ্জলি ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক। করোনায় মৃত ব্যক্তির সৎকার থেকে শুরু করে আক্রান্ত ব্যক্তির সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত এবং টেলিমেডিসিন সেবার মতো প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন লিটন চন্দ্র পাল ও তার স্বেচ্ছাসেবী টিম “সচেতন যুব সমাজ”। করোনার ভয়াল থাবা থেকে বাঁচতে যেখানে নিজেদের সুরক্ষায় ব্যস্ত অনেকেই, সেখানে ঝুঁকি নিয়ে কেন নিজেকে মানবসেবায় জড়িয়ে নিলেন লিটন চন্দ্র পাল, একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরেন তিনি। বললেন মানুষ হিসেবে মানবতার টানেই এই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
লিটন চন্দ্র পাল এ প্রতিবেদককে জানান, করোনাকালের শুরু থেকে আমরা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের নেতৃবৃন্দ অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করে আসছি। ইতিমধ্যেই আমরা ৪ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছি। যার মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে টানা ৩৭ দিন ২৫০০ পরিবারকে এবং পাশাপাশি রোটারি ক্লাব অব রাজধানী সোনারগাঁ ও সারদা অঞ্জলি ফোরামের উদ্যোগে আরো ১৫০০ পরিবারের মাঝে এসব খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এছাড়াও করোনার সংক্রমণ রোধে স্থানীয়দের মাঝে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ও লিফলেট বিতরণের মতো সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে করোনাকালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মাঝে ২০০ পিপিই বিতরণ করা হয়েছে। আমরা কারো অনুদানের আসায় বসে থাকিনি। নিজেদের যা সামর্থ্য তা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। তবে আমাদের এ কাজে প্রবীর কুমার সাহা এবং সরোজ সাহাও একবার সামিল হয়েছিলেন। সেজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
লাশ সৎকারের চিন্তা কিভাবে মাথায় এলো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি বিষয় আমাকে খুব মর্মাহত করলো যখন শুনলাম সংক্রমণের ভয়ে আপনজনের লাশ সৎকারে অনীহা প্রকাশ করেছে স্বজনরা। দেখলাম সবাই ত্রাণ নিয়ে ব্যস্ত অথচ লাশ সৎকারে কঠিন পরিস্থিতি। তখনই উদ্যোগ নিলাম লাশ সৎকারে নিজস্ব কিছু লোকবল নিয়ে কমিটি গঠনের। বিষয়টি নিয়ে পূজা উদযাপন পরিষদের শিপন সরকার শিখন দাদার সাথে আলোচনা করলাম। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পূজা উদযাপন পরিষদের সারা না পেয়ে রিপন ভাওয়াল ও আরো কয়েকজনকে নিয়ে লাশ সৎকারে কমিটি গঠন করি। মানবিক দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেই। যার ধারাবাহিকতায় লাশ সৎকারে ৫টি স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠন করা হয়েছে এবং এই স্বেচ্ছাসেবী টিমের মাধ্যমে এখনো পর্যন্ত ৩৮টি লাশ সৎকার করা হয়েছে। এছাড়াও ঢাকার নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় আমরা সেখানেও করোনায় মৃত লাশ সৎকারে সহায়তা করেছি।
লাশ সৎকারে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলো হলো রিপন ভাওয়াল, অনল পোদ্দার পুলক ও কৃষ্ণা আচার্য্য নেতৃত্বাধীন ‘ওরা ১১ জন’, প্রদীপ সাহা ও সঞ্জয় চক্রবর্তী নেতৃত্বাধীন ‘গৌর নিতাই আখড়া সংগঠন’, কাজল কৃষ্ণ দাস ও সুজন দাস নেতৃত্বাধীন ‘জাগো হিন্দু পরিষদ’, এড. রঞ্জিত দাস নেতৃত্বাধীন ‘হিন্দু মহাজোট’ এবং খানপুরে নিমাই দে ও সুমন সাহার নেতৃত্বে একটি স্বেচ্ছাসেবী দল।
লিটন চন্দ্র পাল আরো বলেন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ করোনাকালে মানবসেবায় একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা কেবল করোনায় মৃত লাশ সৎকারই নয়, অসহায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সঠিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত, তাদের টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান এবং কারো করোনার লক্ষণ দেখা দিলে তাকে করোনা পরিক্ষা করতে সহযোগিতা করছি। একাজে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, হিন্দু যুব পরিষদ এবং হিন্দু ছাত্র পরিষদ এক ও অভিন্ন।
মহতি এই উদ্যোগে কারো উৎসাহ পেয়েছেন কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক, সদর থানা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল আমাদের এই কাজের প্রশংসা করেছেন। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি নাসিক ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ এবং ১৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিউদ্দিন প্রধানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের কথা না ভেবে লাশ সৎকার করে যাচ্ছেন।
এই কাজে নিজের অনুভূতি জানতে চাইলে লিটন চন্দ্র পাল বলেন, চাইলেই মানবসেবা করা যায় না। এই ইচ্ছেটা অন্তর থেকে আসে। আমি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মানবিক সংগঠনের সাথে কাজ করে আসছি। পৃথিবীতে আমরা কেউই চিরস্থায়ী নই। যদি এই ক্ষণিকের আয়ুতে মানুষের জন্য কিছু করে যেতে পারি, তাহলে আমার কর্মফলের জন্য হলেও মৃত্যুর পর মানুষ আমাকে মনে রাখবে।
এসময় তিনি এই মহৎ কাজে সহযোগীতার জন্য স্বেচ্ছাসেবী টিমের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে জেলা যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি আনন্দ কুমার শেরওয়ানি, সাধারণ সম্পাদক ভজন দাস, মহানগরের সভাপতি এড. অঞ্জন দাস, সাধারণ সম্পাদক রিপন কর্মকার, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষ্ণা আচার্য্য, সাবেক তথ্য সম্পাদক অরুণ দেবনাথের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here