নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: বুধবার মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রাষ্ট্র ভাষাকে বাংলা করার দাবীতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জোহা পরিবারের অবদান।

ভাষা আন্দোলনে শরিক হওয়ায় এই পরিবারের সদস্যদের তখন নগরীর জিমখানা থেকে ট্রাকে বেঁধে চাষাড়া পর্যন্ত টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও আন্দোলনের পথ থেকে বিচ্যুৎ হয়নি এই পরিবার।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে জীবদ্দশায় ভাষা সৈনিক নাগিনা জোহার স্মৃতিচারনটি তুলে ধরা হলো:

সেই দিনটি ছিল ১৯৫২ এর ২রা ফেব্রুয়ারী। আমি আমার শ্বশুর খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়ি “বাইতুল আমানের” দ্বিতীয় তলায় শুয়ে ছিলাম, তন্দ্রার মধ্যে ছিলাম। মনে হচ্ছে নীচের তলায় বড় গেট খুলে অনেক মানুষ ভিতরে ঢুকছে, খুব হাঙ্গামা হচ্ছে। এরই মধ্যে ভয়ে ঘুম ভেঙে গেল। আর সত্যিই তাই হলো।

আমার শ্বাশুড়ী আম্মা বললেন ওদিকে যেও না, বাড়ির গেটের ভিতরে অনেক মানুষ ঢুকে পড়েছে। বাড়ির গেটের কাছে একটা বড় গাছ ছিল। ঐ গাছটার উপরে একজন সুঠাম শরীরের মানুষ উঠে বসে ছিল, তারা লোকটাকে নামিয়ে মারতে মারতে বাইরে নিয়ে গেল। গাছ থেকে যে সুঠাম শরীরের মানুষটাকে নামিয়ে মারতে মারতে নিয়ে যায়, ওরা ভেবেছে উনিই জোহা সাহেব। পরে জানতে পারে উনি জোহা সাহেব নন, একজন পথচারীর ভয়ে গাছে উঠেছিলেন। এ ব্যাপারটা ওনাদের কাছে অপমানের ব্যাপার ছিল।

ঐ সময় আমার শ্বশুর আব্বা আমাদের সব মেয়েদেরকে ছাদে চলে যেতে বললেন। এরই মধ্যে নিচের বড় গেটে অনেক মানুষের সাথে মিলিটারিরা বড় লাঠির মাথায় লোহার বল যুক্ত হাতিয়ার দিয়ে গেট ভাঙ্গার চেষ্টা করছে এবং বলছে, “শুয়ারকা বাচ্চা, দরওয়াজা খোল”।

বাড়ির সব মহিলা ও বাচ্চারা ছাদে চলে যায়। আমি খুব সাহস করে আমার শ্বশুর আব্বার সাথে গেট ধরে বন্ধ রাখার চেষ্টা করি। ওপাশ থেকে ওরা ধাক্কা দেয়াতে আমার হাতের স্বর্ণের চুড়ি দরজার ফাঁকে আটকে যায়। আমি ব্যাথা পাই, চুড়ি সব বেঁকে যায়।

আব্বাকে আমি বললাম, “দরজা ধরে রাখা যাবে না এখুনি ভেঙ্গে যাবে, আপনি ছাদে চলে যান।” উনি বললেন, “তুমি ছাদে চলে যাও”। আমি বললাম, “আপনি যান আমি পরে যাচ্ছি”। কিন্তু উনি মানলেন না। আমি ছাদে না যেয়ে সিঁড়িতে গিয়ে দেখি আব্বাও গেট ছেড়ে দিয়ে ভিতরে রান্না ঘরের দিকে চলে যান। তখন আমি ছাদে চলে যাই। তার পর যতটুকু জানিÑআব্বাকে ওরা ভেতরে ঢুকে অনেক অত্যাচার করে।

এরপর সবচেয়ে দুঃখের বিষয় মিলিটারির সাথে বাঙ্গালী পুলিশরাও আব্বাকে নিয়ে ছাদে আসে। উনি পানি খেতে চাইলে আমার দেবর ‘তারা’ দৌড়ে গিয়ে পানি এনে দেয়, উনি কাঁপছিলেন গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে যায়, অত্যাচারের কারণে উনি সোজা থাকতে পারছিলেন না।

তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ওরা আমাদের সবাইকে হুকুম জারি করে একে একে হেঁটে ছাদের এপাশে ওপাশে গিয়ে আবার এক জায়গায় বসতে বলে, আমরা তাই করলাম। ওরা আমার শ্বশুর আব্বাকে ধরে নিয়ে গেল এবং বাঙ্গালী পুলিশরা সান্তনা দিল আধ ঘন্টা পরে ছেড়ে দিবে।

ওরা যাবার পর শ্বাশুড়ী আম্মাকে বলি, চলেন আমরা সবাই দ্বিতীয় তলায় চলে যাই উনি বলেন, “তোমার আব্বা ফেরত আসলে যাব” তখন আমি বলি, ওনার আসতে অনেক দেরি হবে। ওরা অনেক কথা বলবে, আসলে আমি বুঝতে পারি যে, উনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি সবাইকে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় যাই এবং কাজের লোকদের তাড়াতাড়ি রান্না করতে বলি এবং সবাইকে খাবার দিলে শ্বাশুড়ী আম্মা বলেন, আব্বা এলে খাবেন। এখন খাবেন না। আমি বাড়ির সব বাচ্চাদের ও আর সবাইকে খেতে বলি ও বুঝিয়ে দেই আব্বার এখন তাড়াতাড়ি আসা হবে না। আর বুঝতে পারি মিলিটারি আর একবার আসবে।

রাত ৩ টায় আবার মিলিটারি গাড়ি ভরে আসে। সাথে দেখি লুৎফর রহমান ভাই আমাদের অন্য বাড়ি “হীরা মহল” ওখান থেকে ওনাকে নিয়ে আসে এবং আসবাবপত্র ভাংচুর করে। খুব দামি ক্যামেরা নিয়ে যায় এবং আলমারী ভাঙ্গার চেষ্টা চালায় জরুরী কাগজ পত্র নেয়ার জন্য, তখন আমি বলি, “এই চাবি ‘জোহা’ সাহেবের কাছে আছে। উনি এলে দিব, আপনারা দয়া করে ভাঙবেন না। কাল আসেন, আমি চাবি দিয়ে দিব”।

ওরা আমার স্বামী সামসুজ্জোহা সাহেবকে নিয়ে যাবার জন্য আসে আমাদের “হীরা মহলে”। লুৎফর রহমান ভাই ওনার পরিবার নিয়ে হীরা মহলেই থাকতেন। সেখানে জোহা সাহেবকে খুঁজতে যায়। না পেয়ে লুৎফর রহমান ভাইকে সাথে নিয়ে আসে বাইতুল আমানে জোহাকে খুঁজে বের করে দিতে।

আমার শ্বশুর বাড়িতে নীচের তলা সবসময় অনেক মানুষ থাকার ব্যবস্থা থাকতো। গ্রাম থেকে আসা অনেকে এখানে থাকতেন তাদের মধ্যে কয়েকজন মৌলভী সাহেব ও ছিলেন এবং একজন বয়স্ক মানুষ যিনি আমার চাচা শ্বশুর আব্বার বড় ভাই ছিলেন। সবাই খুব আতংকে ছিলেন।

আমি চাচাকে বললাম, “চাচা ওরা এলে আপনি পরিচয় দিয়েন না, বলবেন আমি এ বাড়িতে পড়াই, একজন শিক্ষক”। চাচা বললেন, “কেন?” ভাই বললে কী হবে মা? আমি বলি, “তাহলে আপনাকেও নিয়ে যাবে।” তখন বুঝলেন যখন শত্রুরা উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ও নানা প্রশ্ন করে উনি আমার কথা না শুনে চিৎকার দিয়ে সত্য কথা বললেন, তখনি ওরা উনাদের সাথে যেতে বলে, আর চাচা আমার কাছে এসে বলেন, ‘এটা কী হলো মা, আমি কি করবো’?

আমি বুঝিয়ে বলি “জেলে নিয়ে যাবে তবে চিন্তা করবেন না, আপনাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিবে।” কিন্তু ঐ অবস্থার মধ্যে আমি চাচার কান্ড দেখে হেসে দেই। উনি খুব ইংরেজিতে কথা বলতেন।

তখন আমার দেবর, ননদরা ছোট ছিল, সরাফউদ্দীন, তারা, বাচ্চু, হাসু, বাবু, ও ননদ দুলারী, নীলা, লাইলী সবাই ছোট, মনি, ননী, চম্পা, এরা খুবই ছোট ছোট ছিল, সারা বাড়ি গমগম করতো সেই বাড়ি হঠাৎ থমকে গেল। দেবরদের মধ্যে শাজাহানকেও ধরার চেষ্টা করে কিন্তু ও খুব সরল ছিল বলে প্রশ্ন করে ছেড়ে দেয়।

বাইরে থেকে আরেক দেবর মোস্তফা সারোয়ারকে জেলে নিয়ে যায়। ওরা যখন অপেক্ষা করে “জোহা সাহেব” কে পায়নি তখন চারিদিকে লোক লাগিয়ে দেয় ধরার জন্য।

জোহা সাহেব ছিলেন আমাদের অন্য বাড়ি “হীরা মহলে”। যেখানে মিলিটারিরা ঘেরাও দেয়। উনি বাড়ির কার্নিসে ঝুলে থাকেন, ওনার হাতের উপর দিয়ে মিলিটারিরা হেঁটে যায়। আল্লাহর রহমতে মিলিটারিরা টের পায়নি। আঙ্গুলে অনেক ব্যথা পেয়েছিলেন।
লুৎফর রহমান ভাই ও তাঁর পরিবারের অনেক অবদান এই ভাষা আন্দোলনে রয়েছে। লুৎফর ভাই ও ভাবীর কথা ভুলতে পারি না। ঐ সময়ে উনি জোহা সাহেবকে এবং আরেকজন রাজনীতিবিদ মজিবর রহমান ভাইকে দুটো চাদর দিয়ে গা ঢাকার ব্যবস্থা করেন ও রেল লাইন ধরে পালাবার পথ করে দেন। ওনারা দু’জন নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন রেল লাইন ধরে পায়ে হেঁটে।
লুৎফর রহমান ভাই ও ভাবী এবং তাঁর সন্তানেরা যা করেছেন তা ভুলার নয়। আমি তাদের কাছে চির ঋণী। মহান আল্লাহ্ উনাদের অনেক শান্তি দান করুন।

নাগিনা জোহা বলেন, জোহা সাহেবের সাথে এরপর আমার আর কথা হয় না, উনি ঢাকাতেই গা ঢাকা দিয়ে থাকেন। কারণ ওনার নামে হুলিয়া জারি হয়ে যায়। কেউ যদি খবর দিতে পারে তাহলে ৫০০০ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। আমার বয়স তখন ষোল বছর, মাত্র ছয় মাসের নববধু হয়ে অনেক কষ্টে বুকে সাহস নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করেছিলাম।

‘রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই’ এই শ্লোগানে বাস ট্রাক এ করে মিছিল সব সময় ‘জোহা সাহেব’ করাতেন এবং যখন উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার দাবী উঠে তখনি প্রথম সভা এই “বাইতুল আমানে” অনুষ্ঠিত হয়। বড় বড় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এখানে এসে কি করে প্রতিরোধ করা যায় সেই বিষয়ে একটি সভা করেন, এবং একটি সংগঠন তৈরী করেন যার প্রেসিডেন্ট হন আমার শ্বশুর আব্বা খান সাহেব ওসমান আলী ও পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ছাত্র নেতা জোহাকে। সেজন্যই তাঁকে মেরে ফেলার চেষ্টা চলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলে হামলা, চারিদিকে মিছিল, মিছিলের উপর গুলি বর্ষণ চলতে থাকে, অগনিত লাশ আর রক্ত যেতে থাকে। সালাম, বরকত আরো আরো কত সব নাম শুনতে থাকি।

ভাসানী সাহেব, মানিক মিঞা, শেরে বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আমার বড় ভাই আবুল হাশেম। শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক সহ আরো অনেকে বাইতুল আমানে এসে সভা করেন।

নাগিনা জোহা আরো বলেন, চারদিকে এত বিপদের মাঝে আমি আর স্থির থাকতে পারি না। আমাকে কোন রকমে জোহা সাহেবের সাথে দেখা করানো হয়। এরপর অনেক লুকিয়ে একটি মাটির ঘর ভাড়া নিয়ে ওখানে থাকি যেন কেউ চিনতে না পারে। পরিস্থিতি আরো শোচনীয় অবস্থায় চলে গেলে হুলিয়ার কারণে উনি নিজেই গিয়ে আতœসমর্পণ করেন। এরপর ওনাকে জেলে নিয়ে যায় এবং শর্ত দেয়া হয় যখন ছেড়ে দেওয়া হবে তখন দুই বছর নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে পারবেন না। পরে দয়া করে এক বছর কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমি তখন আমার নিজের আব্বা আম্মার সাথে থাকি এবং শুধু অসুস্থই হতে থাকি। আমার বড় ভাই কামরুজ্জামান আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ডাক্তার বলে আমার শরীরে কোন রক্তই নেই।

আমরা সবাই তাকে জেল গেটে নিয়ে আসি। পরে মমতাজ বেগম, মোস্তফা সারোয়ার ও আব্বাকে ছেড়ে দেয় কিন্তু জোহা সাহেবকে অনেক পরে ছাড়ে।

ভাবীর ছোট ভাই মোস্তফা মনোয়ার বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী উনিও প্রচুর কষ্ট করেন এবং অনেক অবদান রাখে ঐ ভাষা আন্দোলনে, পোষ্টার তৈরী করে রাত জেগে জেগে। ভাবী ও মোস্তফা মনোয়ার হচ্ছেন বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। এই ভাবীর কারণেই সেদিন ‘জোহা সাহেব’ আল্লাহর রহমতে বাঁচার পথ পায়। আমি ঐ বয়সে সবাইকে সামাল দিচ্ছিলাম কিন্তু নিখোঁজ মানুষটার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। তার কয়েক দিন পর ওনার একটা ফোন আসে, শুধু বলে, ‘আমি ঠিক আছি, তুমি চিন্তা করো না’। এরপর থেকে রাতে একটু ঘুমাতে পারি। সবাইকে খবরটা দিই।

জনাব শামসুল হক ভাষা আন্দোলনের সময় উর্দুকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলখানায় নিয়ে রাখেন। সেখানে তিনি পাগলের মত হয়ে যান। সবাইকে ‘অ-আ’ শিখানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন এবং একসময় তিনি বদ্ধপাগল হয়ে যান। শামসুল হক উর্দুকে বর্জন করে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বদ্ধপাগল অবস্থায় জেল থেকে বেরিয়ে তিনি চির নিদ্রায় শায়িত হন।

উল্লেখ্য, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে আন্দোলন করতে গিয়ে সামসুজ্জোহা ও তার পরিবারের সদস্যদের জিমখানা থেকে ট্রাকের সাথে বেঁধে চাষাড়া পর্যন্ত টেনে আনে।

জীবদ্দশায় নাগিনা জোহার এই স্মৃতিচারনটি সংগ্রহ করেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শিরিন বেগম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here