নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: প্রায় ১০ মাস গর্ভে ধারনের পর ফুটফুটে এক কণ্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিল সাবিহা তাসমিয়া ঝুমা (২৫)। কিন্তু বিধাতা হয়তো ছিল অসহায়! তাইতো নবজাতক কণ্যা সন্তানের মুখ দেখার পূর্বেই সেই বিধাতার কাছে চলে যেতে হয়েছে এই জন্মদাত্রী মাকে।
এরপর ময়নাতদন্তের নামে পুলিশ ঝুমার লাশকে হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে গেলেও লাশ ঘরের পরিবর্তে তার ঠাই হয়েছিল সদর মডেল থানার কম্পাউন্ডে। দীর্ঘ প্রায় ১২ ঘন্টা যাবত ফ্রিজবাহী এ্যাম্বুলেন্সে পড়েছিল প্রসূতির নিথর দেহ।

কিন্তু তাতে কি, যেই ডাক্তারের দায়িত্ব অবহেলার কারনে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছিল ঝুমাকে, সেই ডাক্তার খ্যাত কসাই অমল রায় ঐ ১২ ঘন্টা থানার ভেতরে ছিল জামাই আদরে। দিন থেকে মধ্যরাত অবদি চিকিৎসক সংগঠনের নেতা থেকে উচ্চ পর্যায়ের সরকারী আমলা পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক ব্যাক্তির তদ্বির প্রচেষ্টার পর বর্হু নাটকীয়তা শেষে সমঝোতায় এই গাইনী ঘাতক বাড়ী ফিরেন স্বাচ্ছন্দে। আর স্বজনদের অশ্রুজলে দুর্ভাগা প্রসূতি ঝুমার ঠাঁই মিলে কবরস্থানে।

জানাগেছে, প্রায় ১০ মাস যাবত নারায়ণগঞ্জের গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা: অমল রায়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন নগরীর উত্তর মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান শরীফের স্ত্রী সাবিহা তাসমিয়া ঝুমা। গত ৮ মার্চ ভোর সাড়ে ৬টার দিকে তার প্রসব বেদনা উঠলে তাকে মেডিস্টার জেনারেল হাসপাতালে এনে ভর্তি করানোর পর সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে ডাক্তার অমল রায়ের তত্ত্বাবধানে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে প্রসূতির প্রচুর রক্তক্ষরন হলে সকাল ১১ টায় অত্র হাসপাতালের ডাক্তারগন বোর্ড মিটিংয়ে বসে তার স্বজনদের জানান, রোগীর রক্তক্ষরন হচ্ছে, তার জরায়ু কেঁটে ফেলতে হবে। তবে ৭ ব্যাগ রক্ত লাগবে। এ সময় প্রসূতির সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে তার স্বজনরা ৭ ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু দুপুর ২ টায় চিকিৎসক জানান রোগীনির মৃত্যু হয়েছে।

এরপর ক্ষোভে উত্তাল ঝুমার স্বজনরা হাসপাতাল ভাংচুরসহ সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে সদর মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রসূতির গর্ভপাতের সময় অপারেশন থিয়েটারে থাকা গাইনী ডাক্তার অমল কুমার রায়, তার সহযোগী ডাক্তার বদরুদ্দোজা এবং ওটি সিস্টার মুনা (৩০), ঝর্ণা (২৮) ও মৌসুমী (৩০) কে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

আর তখন প্রসূতির লাশটি হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে পুলিশ নারায়ণগঞ্জ ১শ’ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেও তা ফ্রিজবাহী এ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে রাখেন থানায়।

কিন্তু দায়িত্ব অবহেলায় প্রসূতির মৃত্যুর জন্য দায়ী গাইনী ডাক্তার অমল কুমার রায়সহ আটক ৫ জন সদর মডেল থানায় ছিলেন জামাই আদরে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

এরপর রাতে সরেজমিন সদর মডেল থানায় গিয়ে দেখাগেছে, গাইনী ঘাতক অমল রায়কে বাঁচাতে তদ্বির করতে থানায় আসেন বিএমএ জেলা সভাপতি ডা: শাহনেওয়াজ, স্বাচিপ নেতা, নারায়ণগঞ্জ ৩শ’ শয্যা হাসপাতালের গাইনী চিকিৎসক ডা: জাহাঙ্গীর আলম, কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা এড. মন্টু ঘোষ, পপুলার ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, মেডিনোভা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিকপক্ষ সহ আরো অনেকে।

এছাড়াও সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অবদি প্রায় দেড় থেকে দুইশ ব্যাক্তি সদর মডেল থানার ওসিকে ফোন করে তদ্বির করেন। নারায়ণগঞ্জের পূর্বতন একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মাঞ্জারুল মান্নান এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের থেকে জনৈক কর্মকর্তা অমল রায়ের মুক্তির জন্য তদ্বির করেন বলে জানাযায়।

দীর্ঘ সমঝোতার পর রাত ২ টায় প্রসূতি ঝুমার স্বামী কামরুল হাসান শরীফ ও তার শ্বশুর থানায় এসে আপোষনামা নিয়ে ঝুমার লাশ নিয়ে যান। আর অবহেলার দায়ের আটক ডাক্তারসহ ৫ জন সহসাই মুক্তি পেয়ে যান।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে সদর মডেল থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) মো: কামরুল ইসলাম পিপিএম জানান, ‘থানার বাহিরে উভয়পক্ষের সমঝোতার পর প্রসূতির স্বামী আপোষনামা দাখিল করায় তাকে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। আর আটক ডাক্তার অমল রায়সহ ৫ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’

আর বিভিন্নজনের তদ্বিরের বিষয়টি স্বীকার করে ওসি আরো বলেন, ‘ডাক্তারের জন্য বহুব্যাক্তির ফোন কল রিসিভ করতে হয়েছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here