নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণঞ্জের আলোচিত স্কুল-ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকান্ডের ৫ বছর অতিবাহিত হতে চললেও তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি র‌্যাব। দীর্ঘ বছরেও ত্বকী হত্যার অভিযোগ পত্র আদালতে দাখিল না হওয়ায়, এরজন্য রাজনীতিকেই দায়ী করছেন বিশিষ্টজনেরা।
তাদের মতে, ত্বকীকে হত্যার নেপথ্যে তার বাবা রফিউর রাব্বী কখনো নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের পুত্র অয়ন ওসমানকে আবার এখন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ এ কে এম নাসিম ওসমানের পুত্র আজমেরী ওসমানকে দায়ী করায় রাজনৈতিক প্রভাবে মামলার তদন্ত কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৬ মার্চ ২০১৮) পূর্ণ হচ্ছে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচারহীনতার ৫ বছর। রাজনীতির বেড়াজালে আটকে যাওয়া ত্বকী হত্যার অভিযোগ পত্র দাখিলের দাবীতে প্রতি মাসেই সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের মোমশিখা প্রজ্জলন, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করে বিবৃতি দেয়ার পাশাপাশি খোদ সাংসদ শামীম ওসমানও ত্বকী হত্যার বিচার দাবী করলেও তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব এখনো আদালতে চার্জশীট দাখিল করতে পারেনি।

মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকাল ৪টার দিকে তানভীর মুহম্মদ ত্বকী নিখোঁজ হয়। ত্বকীর বাবা ও আত্মীয় স্বজনরা চারদিক খোঁজাখুঁজি করেন। না পেয়ে সন্ধ্যায় ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী নারায়নগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন। দুই দিন পর সকাল পৌনে ১০টার দিকে কুমুদিনী জোড়াখালে ত্বকীর লাশ পাওয়া যায়। পরে রাফিউর রাব্বী বাদী হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে একটি হত্যা মামলা করেন।

জানা গেছে, ময়নাতদন্ত রিপোর্টে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক উল্লেখ করেছেন ত্বকীকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে এই মামলাটি পুলিশ তদন্ত করলেও পরে হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর র‌্যাব এই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইউসুফ হোসেন লিটন, সুলতান শওকত ভ্রমর এবং তায়েব উদ্দীন জ্যাকি ও সালেহ রহমান সীমান্তকে গ্রেফতার করে। এর আগে পুলিশ গ্রেফতার করে রিফাত বিন ওসমানকে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে লিটন ও ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

তখন র‌্যাব কর্মকর্তারাও বলছিলেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। যে কোনো সময় চার্জশীট দেয়া হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই ধরা পড়ে খুনীদের জবানবন্দি মিলছে না। কিছু তথ্যেও রয়েছে গড়মিল। ফলে নতুন করে তদন্ত শুরু করে র‌্যাব।

প্রথমত, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ভ্রমর বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের অফিসে নিয়ে নির্যাতনের পর ত্বকীকে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দি করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়া হয়।

এখন প্রশ্ন উঠেছেল, নির্যাতনের পর লাশ বস্তাবন্দি করা হলে লাশের পায়ে স্যান্ডেল এল কী ভাবে। আর বস্তা থেকে লাশটি বের হলোই-বা কী ভাবে? আজমেরী ওসমানের অফিস থেকে রক্তমাখা প্যান্ট উদ্ধারের পর বলা হয়েছিল এটি ত্বকীর। অথচ লাশ উদ্ধারের সময় ত্বকীর পরণে জিন্সের প্যান্ট পাওয়া গেছে।

দ্বিতীয়ত, প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবাবনবন্দি দেয়া লিটন বলেছে, সালেহ রহমান সীমান্ত নামের এক যুবকের বাড়ীতে ত্বকীকে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে শীতলক্ষ্যার শাখা খালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বস্তা থেকে লাশ বের করে ফেলে দেয়া হয়। এখানে দুই জনের জবানবন্দিতে কোনো মিল নেই। পাশাপাশি, দুই জনেই বস্তার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বস্তা উদ্ধার হয়নি। তাহলে বস্তাটি গেল কোথায়? আর বস্তায় ভরা লাশের পায়ে বেল্ট বিহীন চামড়ার স্যান্ডেল থাকে কী ভাবে? পায়ের চামড়ার স্যান্ডেল থেকেই তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, যেখান থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে, তার আশপাশেই খুন হয়েছেন ত্বকী। আর এ খুন পরিকল্পিত নয়, ঘটনার আকস্মিকতায় হয়ত হত্যাকান্ড। তবে কারা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে, তা হয়ত তদন্তে বের হয়ে আসবে।
তবে কি আসলেই রাজনৈতিক কারনে ত্বকী হত্যার চার্জশীট দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে কিনা- এব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাব-১১’র আইন শাখার কর্মকর্তা এএসপি শাহ্ মো: মশিউর রহমান পিপিএম নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডিকে জানান, ‘তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতই অভিযোগ পত্র দাখিল করা হবে।’

এদিকে, ত্বকী হত্যার নেপথ্যে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ বরাবরই ওসমান পরিবারকে দায়ী করে আসলেও গত বছরের ২২ এপ্রিল নগরীর ডিআইটিতে ধর্ম অবমাননাকারী রফিউর রাব্বীর বিচার দাবীতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সাংসদ শামীম ওসমানও ত্বকী হত্যার বিচার দাবী করেছিলেন।

তিনি ত্বকী হত্যার বিচার দাবী করে বলেছেন, ‘ত্বকী হত্যাকান্ডের ঘটনায় আমাদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে। অথচ কারা কেন কী কারণে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে সব আমরা জানি। আমিও ওই বাচ্চা ছেলের হত্যার বিচার চাই। অচিরেই সংবাদ সম্মেলন করবো। প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইবো।’

অপরদিকে, ত্বকী হত্যার ৫ বছর পূর্তিতে ৪ দিন ব্যাপী কর্মসূচী ঘোষণা করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ।

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ৫ বছর উপলক্ষে ৬ মার্চ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটায় বন্দর ঘাট থেকে বন্দর সিরাজ শাহ এর আস্তানায় ত্বকীর কবর জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠ অনুষ্ঠিত হবে।

৭ মার্চ বুধবার বিকাল তিনটায় নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিশু সমাবেশ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী, শিক্ষাবিদ ড. হায়াৎ মামুদ সহ অনেকে।

৮ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকার কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ৫ বছর’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, এডভোকেট সুলতানা কামাল, ড. বদিউল আলম মজুমদার, অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, অধ্যাপক শফি আহমেদ, ডা সারোয়ার আলী, মামুনুর রশীদ, মফিদুল হক, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খালেকুজ্জামান, জোনায়েদ সাকী, খন্দকার মুনিরুজ্জামান, মিজানুর রহমান খান, গোলাম মোর্তোজা অজয় দাশগুপ্ত প্রমূখ।

৯ মার্চ শুক্রবার বিকাল সাড়ে তিনটায় নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নং রেলগেট চত্ত্বরে সমাবেশ অনষ্ঠিত হবে। সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন ভাষাসংগ্রামী ও সাংবাদিক কামাল লোহানী, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও স্থানীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here