নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ‘প্রবাদে আছে, “চিলে কান নিয়েছে, কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছন পেছন ছুটছি।” যেই প্রতিষ্ঠানের দূর্নীতি বন্ধে নিজস্ব অর্থায়নে একের পর এক উন্নয়ন করে গেলাম, আজ সেই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ক্যলেংকারিতে আমাকে জড়ানো হয়েছে। যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। যারা আমায় আজ অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছেন, আমি আশা করছি, সঠিক ভাবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখলে হয়তো আমার সম্পর্কে তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটবে।’
নগরীর প্রাচীণ বিদ্যাপাঠ গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সভাপতিকে জড়িয়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশের পর নারায়ণগঞ্জের আলোর কাছে এভাবেই নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মুকুল। পাশাপাশি বর্তমান কমিটিকে অবৈধ কমিটি ও রাজনীতিতে তাকে জড়ানোয় বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

মুকুল বলেন, যদি আমি স্কুলের অর্থ আত্মস্বাৎের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতাম তাহলে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার পর পর কোন স্বার্থে দূর্ণীতি ঠেকাতে ২ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রশ্ন মেশিন ক্রয়, সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণের পর পরই স্কুলের কয়েকজন শিক্ষকের ৩ লাখ টাকার ঋণ নিজ অর্থায়নে পরিশোধ, স্কুলের বিদ্যুৎ বিভ্রান্তি দূরী করণে সাড়ে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে জেনারেটর ক্রয় করলাম। এছাড়াও বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনা পূর্বক আগামী সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা জোড়দারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিত নিশ্চিতকল্পে ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন বসাতে যাচ্ছি। যদি আমি দূর্নীতিগ্রস্থ হতাম, তাহলে কেন প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অর্থায়নে এতো সকল উন্নয়ন কাজ করলাম?

তিনি আরো বলেন, ‘যারা বর্তমান কমিটিকে অবৈধ এবং আমাকে অবৈধ কমিটির সভাপতি বলে দাবী করছেন, তারা হয়তো বা জানেন না কমিটির অবশিষ্ট মেয়াদকালের জন্য পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড আমাকে বহাল রেখেছেন। যার প্রমানাদি আমার কাছে রয়েছে। তারা চাইলেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। এছাড়াও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য আনোয়ার হোসেন ভূইয়ার শূণ্য পদে মোঃ হাসান টিটু এবং মোঃ শরীফ মোল্লার স্থলে জাকির হোসেন কে অবশিষ্ট মেয়াদকালের জন্য স্থলাভিষিক্ত করেছিল শিক্ষাবোর্ড। বাকী ৫টি শূণ্য পদে স্থলাভিষিক্ত করার জন্য শিক্ষাবোর্ড ম্যানেজিং কমিটির অন্যান্য সদস্যদের উপড় দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধানশিক্ষক বরাবর শিক্ষাবোর্ডের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সংক্রান্ত তথ্য জানানো হয়েছে। সুতরাং এখানে রাজনৈতিক ভাবে আমার প্রভাব খাটানোর কোন প্রশ্নই আসে না আর আমি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তও না।’

প্রকাশিত সংবাদে তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে মুকুল বলেন, ‘এসব মনগড়া খবর। আমি যদি দূর্নীতিবাজ হতাম, তাহলে আমি কখনোই প্রতিষ্ঠানের বিগত দিনের দূর্নীতির চিত্র প্রশাসনের কাছে তুলে ধরতাম না। উল্টো পূর্বের ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন দূর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ আমার দাড়স্থ হলে আমি প্রতিষ্ঠানের দূর্নীতি প্রশাসনের কাছে প্রমাণাদিসহ পেশ করায় ম্যানেজিং কমিটির দুর্নীতিগ্রস্থরা পদত্যাগ করেছিলেন। ওইসময় তারা আমার নামে বিভিন্ন মিথ্যাচারও করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি তদন্তে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসাবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ সরোয়ার হোসেন বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগের কোন সত্যতা না পেলেও উল্লেখিত পদত্যাগকারী কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন, শরিফ মোল্লাসহ সাত জনের বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতির প্রমান পেয়েছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে বেতন বইয়ের হিসাবে গড়মিল, একই শিক্ষক দুটি পদে থেকে বেতন ভোগ, ডায়েরী কেলেংকারী, শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ানের নামে নিজেদের পকেট ভারী, একটি প্রকাশনার বই কিনতে বাধ্য করা সহ আরো বিস্তর অভিযোগ সামনে আসে।’

এদিকে শিক্ষার্থীদের টিফিনের বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক শিক্ষকই দাবী করেছেন, স্কুলের শিক্ষক প্রতিনিধি মুঈন উদ্দিন তার নিজ দোকান হতে শিক্ষার্থীদের টিফিনের সময় বাশি খাবার দিয়ে বিগদ দিন গুলোতে লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মুকুল ওই টিফিন বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে চাইলে ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকদের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে চলে যায়। এসময় ওই চক্রটি তার নামে বিভিন্ন মিথ্যাচার করতে থাকে যা ভিত্তিহীন।

জানাযায়, শহরের ডিআইটিস্থ গণবিদ্যা নিকেতন স্কুলে বিগত দিনগুলোতে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রতিনিধি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের যোগসাজোসে লাগামহীন দূর্ণীতির ও অনিয়মের চিত্র স্থানীয় পত্র পত্রিকাগুলোতে উঠে আসে। এরই প্রেক্ষিতে দূর্ণীতি রোধে প্রতিষ্ঠানটিতে অডিট শুরু হলে শিক্ষক প্রতিনিধি ও ম্যানেজিং কমিটির ৭ সদস্য পদত্যাগ করেন। এসময় তারা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ আনেন। এখানে উল্লেখ্য যে, পদত্যাগকারী সদস্যদের ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সভাপতি গুণকির্তণ করতে শোনা গেছে।

তবে তদন্তের কথা শুনতেই তাদের আচরণ বদলে যায়। বিষয়টি নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মুকুল জেলা প্রশাসক বরাবর এসকল অনিয়ম ও দূর্ণীতি তদন্তের আবেদন করলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গত ২৫ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে বেশ কিছু বিষয়ে তদন্ত শুরু করেন। প্রথম দিনে তদন্ত কমিটি ডায়েরী কেলেংকারিসহ বেশ কিছু অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথিপত্র জব্দ করেন। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের বেতন ভাতাদি বিষয়ে তদন্তে যায় উক্ত তদন্ত কমিটি। যার প্রধান ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোঃ সরোয়ার হোসেন। এসময় তিনি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের বেতন ভাতাদি কীভাবে এবং কোন পন্থায় পরিশোধ করা হচ্ছে এসকল বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এসময় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর বিষয় তদন্তে উঠে আসে। যার মধ্যে সরকারি বিধি মোতাবেক একজন শিক্ষক একই প্রতিষ্ঠানের দুটি দায়িত্বে থেকে বেতন নিতে না পারলেও পূর্বের ম্যানেজিং কমিটির যোগসাজোসে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক এম এ কাইয়ুম হাই স্কুল তথা কিন্ডার গার্টেন থেকে বেতন ও সম্মানী পেয়ে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রশ্ন তুললেও কমিটির অন্য সদস্যরা বিষয়টি পূর্বে থেকে চলে আসছে দাবী করলে এ বিষয়ে সভাপতির একার পক্ষে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের বেতন বইয়ে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যেটা দেখে তদন্ত কমিটি অবাক হয়ে যান। শিক্ষার্থীদের বেতন বইয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত বেশ কিছু শিক্ষার্থীর বেতন মওকুফ করে তাদের কাছ থেকে নাম মাত্র অর্থ আদায় করা হলেও সেখানে আদায়কারীর স্বাক্ষর ছিল অস্পষ্ট। শুধু তাই নয়, কার অনুমতিতে এসকল শিক্ষার্থীদের বেতন মওকুফ করা হলো, তা নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়াও রেজিষ্টার বুকে এমন কিছু শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ্য রয়েছে, যারা উক্ত প্রতিষ্ঠানের নয়, অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এই স্কুলের নামে পরিক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছেন। তবে তাদের কাছ থেকেও ভর্তি ফি ও বেতন বাবদ অর্থ আদায় করা হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবী, শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি ক্রমেই ওই শিক্ষার্থীদের এই স্কুলের নামে পরিক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও তদন্তের শুরুতে কয়েকটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে আরো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত শিক্ষকের মাঝে দিবা শাখায় ১০ জন শিক্ষক ও ৬ জন অফিস সহকারী এবং প্রভাতী শাখায় ৪জন শিক্ষক ও ৩ জন অফিস সহকারীসহ সর্বমোট ১৪ জন শিক্ষক ও ৯ জন অফিস সহকারী নন-এমপিও ভুক্ত হিসেবে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটিতে একাউন্টেড ও সহকারী একাউন্টেড হিসেবে নিযুক্ত ২ কর্মচারীও নন-এমপিওভুক্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here