নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে অতীত থেকে বর্তমান, দল বদলের শীর্ষে আছে এখন বিএনপির রাজনীনিতিবিদরা। শীর্ষ থেকে তৃণমূল, সর্বস্তরেই আছে নেতাদের দল বদলের রেকর্ড। যখন যে যেই দলে সুবিধা পান, তখন সে সেই দলেই গিয়ে যোগদান করেন। আবার যখন প্রয়োজন হয়, তখন ফের বিএনপিতে এসে যোগদান করেন। পান দলের নেতৃত্ব দানের শীর্ষ পদও।
আর দল বদলের পরেও পুনরায় দল বদলকারীরা দলে ফিরতে পারায় এবং দল থেকে কাউকে অব্যাহতি দেয়া বা বহিস্কার করার পরেও পুনরায় পুনর্বহালের সুযোগ দেয়ার কারনে বিএনপিতেই সবচেয়ে বেশী নেতাকর্মীদের দল বদলের ঘটনা ঘটে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা গেছে, সাবেক এমপি ও বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য মো: গিয়াসউদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র সভাপতি এড. আবুল কালাম, সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, জেলা বিএনপি’র সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, সহ সভাপতি মো: শাহ আলমের মতো হাইপ্রোফাইল নেতার সাথে সাবেক পৌর প্রশাসক আ: মতিন প্রধান, সাবেক বিএনপি নেতা কামাল মৃধা, কুতুবপুর ইউনিয়ন ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও বিএনপি নেতা রোকন উদ্দিন, কামাল হোসেন পাটোয়ারীর মতো তৃণমূল কর্মী পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বার্থে কোন না কোন সময় দল বদল করেছেন।

কেউ আওয়ামীলীগ ছেড়ে বিএনপিতে এসেছে, আবার কেউবা বিএনপি ছেড়ে আওয়ামীলীগে গিয়ে সুবিধা করতে না পেরে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করেছেন বিএনপিতে। দলে থেকেও মূলধারার বিপরীতে গিয়ে সংস্কারবাদী সেজেছিলেন কেউবা। আর এসব স্বার্থপর সুবিধাবাদী নেতাদের ব্যক্তিগত লোভ লালসার কারনে ভাবমূর্তি নষ্ট হয় বলে দাবী তৃণমূলের।

ঘটনা সূত্রে প্রকাশ, সাবেক এমপি ও বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য মো: গিয়াসউদ্দিন ছাত্র জীবন থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। শুরুতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় যোগ দেন বিএনপিতে। বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন লাভ করে হয়ে যান সংসদ সদস্য।

এরপর থেকে বিএনপি’র সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পার করে দিয়েছেন প্রায় দেড় যুগ। ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সিদ্ধিরগঞ্জের অধিবাসী গিয়াসউদ্দিনের বিকল্প হেভিওয়েট কোন প্রার্থী তৈরী না হওয়ায় এবং সিদ্ধিরগঞ্জের একটা অংশের বিশাল জনপ্রিয়তায় মো: গিয়াসউদ্দিন খুব অল্প সময়েই নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’র নীতি নির্ধারকদের একজন হয়ে যান।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামানের রাজনীতির হাতেখড়ি জাসদের মাধ্যমে। পরে বিএনপি’র অঙ্গ সংগঠন যুবদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে শুরু করেন বিএনপিতে তার পথচলা। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাঠে না থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি বনে যান।

মূলত ব্যবসায়ী পরিচয়ের শাহ আলমের রাজনীতির হাতেখড়ি কল্যাণ পার্টির রাজনীতির মধ্য দিয়ে। কিন্তু ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’র রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে কল্যাণ পার্টির মো: শাহ আলমের। কল্যাণ পার্টিকে পল্টি দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন শাহ আলম এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামীলীগ প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর কাছে পরাজিত হন। তবে সর্বত্র নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’র শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

গত প্রায় এক যুগ ক্ষমতাহীন দলটির ক্রান্তিকালে নেতাকর্মীরা হামলা মামলায় জর্জরিত হয়ে পরলেও শাহ আলমের গায়ে এর আচড়টিও পরেনি। প্রায় এক যুগ বিরোধী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও কোন মামলার শিকার না হওয়ার মতো অবিশ^াসী গল্পের ¯্রষ্টা হচ্ছেন শাহ আলম। তবে অতি সাম্প্রতিক কাঁচপুরের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক মামলায় আসামী করা হয় মো: শাহ আলমকে। এই দীর্ঘ সময়ে জাতীয় বা দলীয় কোন কর্মসূচিতে মাঠে তাকে দেখা না গেলেও কমিটি গঠনের বেলায় বড় পদেই অধিষ্ঠিত হন তিনি। ২০০৯ সালে আংশিক গঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র কমিটিতে ছিলেন সিনিয়র সহ সভাপতি আর নব গঠিত জেলা কমিটিতে পেয়েছেন সহ সভাপতি পদ। অবশ্য এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’র এক প্রভাবশালী নেতা অফ দ্যা রেকর্ডে বলেছিলেন, দলের যেমন ত্যাগী নেতার দরকার আছে, তেমনি টাকারও প্রয়োজন আছে। আর তাই শাহ আলমের মতো লোকেরাও হয়ে যান নেতা!

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি এড. তৈমূর আলম খন্দকারের হাত ধরে বিএনপি’র রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালের। মাঝে ২০০১ পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীণ অবস্থায় পল্টি দিয়ে যোগ দেন এলডিপিতে। কিন্তু সেখানে বেশীদিন সুবিধা করতে না পেরে পুনরায় ফিওে আসেন বিএনপিতে। কর্মীবিহীন ওয়ান ম্যান শো নেতা এটিএম কামাল সব সময় ¯্রােতের অনুকূলে তরী বেয়ে যান।

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের রাজনীতি ছেড়ে জাতীয় পার্টি হয়ে বিএনপিতে আসেন সাবে পৌর প্রশাসক আ: মতিন প্রধান। দীর্ঘ সময় বিএনপিতে থেকে অতি সম্প্রতি পুনরায় ডিএনডি বাঁধের উন্নয়ণ প্রকল্পের কাজ উদ্বোধনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানানোর লক্ষ্যে গত ১৫ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জে থানা আওয়ামীলীগ আয়োজিত সমাবেশে পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম হিরু বীর প্রতিক এর উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ¦ মজিবুর রহমানের হাতে ফুলের ‘নৌকা’ তুলে দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক পৌর প্রশাসক ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা আলহাজ¦ আব্দুল মতিন প্রধান কয়েকশত নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপি থেকে আওয়ামীলীগে যোগ দেন।

আর একই কারনে গত ১৯ অক্টোবর কুতুবপুর ইউনিয়নাধীন দেলপাড়া মাঠে ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগ আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম হিরু বীর প্রতিক এর উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই ও ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ সাইফুল্লাহ বাদলের হাতে ফুলের ‘নৌকা’ তুলে দিয়ে কয়েকশত নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপি থেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন কুতুবপুর ইউনিয়ন ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও বিএনপি নেতা রোকন উদ্দিন ও কামাল হোসেন পাটোয়ারী।

প্রথমে আওয়ামীলীগ ও পরে জাতীয় পার্টি ঘুরে বিএনপিতে এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপি নেতা কামাল মৃধা। কিন্তু পল্টিবাজি মনোভাবের কারনে রাজনীতিতে বেশী দিন স্থায়ী হতে পারেননি। দেশ ছেড়ে চলে যান বিদেশে। দীর্ঘ প্রবাশ জীবন শেষ করে অতি সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে এসে মেট্রো রেল বাস্তবায়নের দাবী নিয়ে পুনরায় আলোচনায় আসার চেষ্টা করছেন এই সুবিধাবাদী নেতা।
এছাড়াও রূপগঞ্জ, আড়াইহাজারে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here