নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগকে নিজেদের প্রতিপক্ষ বা ‘শত্রু’ হিসেবে ভেবে দলীয় নেতৃবৃন্দদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় বিএনপি, ঠিক তখন থেকেই তার উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী এক প্রার্থী দলীয় আরেক পদ প্রার্থীকে দমানো, ত্যাগী নেতাদের পরিবর্তে বিতর্কিত নেতাদের জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটিতে পদ দেয়া, শীর্ষ নেতাদের পছন্দ অনুযায়ী কমিটিতে পদ না পাওয়া, বিভিন্ন অঙ্গগঠনের অনুগামী নেতাদের নতুন কমিটির বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠ করা, বিএনপির শীর্ষ পদেও থেকেও একাধিক নেতার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের চাটুকারিতা করা, নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব বলয় গড়ে তোলাসহ বহুবিধ কারনে ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তে নারায়ণগঞ্জে বিএনপিই এখন বিএনপির ‘শত্রু’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ঘটনার সূত্রে প্রকাশ, ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে সরকারী দলের মামলা হামলার শিকার হয়ে সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’র নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। তাই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে ঘোষনা করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি’র আংশিক কমিটি। কিন্তু ঘোষনার পর থেকেই বিতর্কিত হতে থাকে নতুন কমিটি। রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করা ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে টাকাওয়ালা ঘরকুনো নেতাদের দিয়ে কমিটি গঠন করায় শুরু হয় বিতর্ক।

প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে কাজী মনিরুজ্জামানকে সভাপতি ও অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সাধারন সম্পাদক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি এবং এড. আবুল কালামকে সভাপতি ও এটিএম কামালকে সাধারন সম্পাদক করে মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা হওয়ার থেকেই পদবঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভে উক্ত কমিটি দু’টির নেতৃত্বদানকারীদের অযোগ্য হিসেবে দাবী করে খোদ বিএনপি মহাসচিবের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এড. তৈমূর আলম খন্দকার ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি আলহাজ¦ গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ।

কারন, জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে গিয়াস উদ্দিন ও মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে সাবেক জেলা সভাপতি এড. তৈমূর আলম খন্দকার নেতৃত্বে আসতে জোর লবিং করেছিলেন। কিন্তু কমিটিতে অন্তুর্ভুক্ত হতে পারায় নতুন কমিটির নেতৃত্বে থাকা নেতৃবৃন্দরা রীতিমত তাদের ‘শত্রু’ বনে যান।

এরপর নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র নতুন কমিটি ঘোষনার পর বিতর্কিত নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নেতিবাচক আচরনের কারনে স্পষ্টত দুই ভাগ হয়ে যায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি। মহানগরের সভাপতি এড. আবুল কালামের চাটুকারিতা করতে গিয়ে সিনিয়র সহ সভাপতি এড. সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একের পর বিবৃতি দিয়ে এই বিভক্তি সৃষ্টি করেন টিপু।

যার ফলস্বরূপ নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র কোন অনুষ্ঠানে আর দেখা যায় না এড. সাখাওয়াতকে। আবার নারায়ণগঞ্জ মহানগরের ব্যানারে এড. সাখাওয়াত কোন কর্মসূচি পালন করলে সেখানে দেখা মিলেনা কমিটির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের। সাখাওয়াতের প্যারালাল কর্মসূচির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পদত্যাগের ঘোষনা দেন সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল।

আর নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনেও নিজের প্রার্থীতা হওয়ার ঘোষণা দিয়ে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ মহানগর বিএনপির সভাপতি এড. আবুল কালামের ‘শত্রু’ বনে যান।

শুধু তাই নয়, রাজপথের পরিবর্তে নিজের বাড়ীতে দলের অস্থায়ী কার্যালয় করে ঘরে বসেই বেশীর ভাগ দলীয় কর্মসূচী পালন করায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের কাছে সমালোচিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের ‘শত্রু’ বনে যান মহানগর বিএনপির সভাপতি এড. আবুল কালাম ও সাধারন সম্পাদক এটিএম কামাল।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে সাবেক গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ জেলা বিএনপির কমিটির নেতৃত্বে আসতে না পারলেও আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের যখন ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী উক্ত আসনে আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী ফতুল্লা থানা বিএনপির স্বঘোষিত সভাপতি শিল্পপতি শাহ আলমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একটি অনুষ্ঠানে এসে সম্প্রতি তাকে উক্ত আসনের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে যান। আর এতে সমর্থণ জানান, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ।

পরবর্তীতে গিয়াসের কাছে ‘শত্রু’ বনে যান শাহ আলম ও নজরুল ইসলাম আজাদ।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নানের মধ্যেও বিভেদ চলে আসছে দীর্ঘদিন যাবত।

নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান খসরু ও তার ভাই সাবেক এমপি আলহাজ¦ আতাউর রহমান আঙ্গুরের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাট্টা করে তুলছেন উক্ত আসন থেকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং জিয়া পরিবারের নাম ভাঙ্গিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটিতে পদ দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিজ করায়ত্বে আনার প্রচেষ্টাকারী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। যিনি ইতিমধ্যেই খসরু ও আঙ্গুরের কাছে ‘শত্রু’ বনে গেছেন বলে জানান স্থানীয় তৃণমূল নেতৃবৃন্দ।

নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশায় জেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি কাজী মনিরুজ্জামান এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এড. তৈমূর আলম খন্দকারের মধ্যেই বেশী ‘শত্রুতা’ চলে আসছে বহু বছর যাবত। তাদের কারনে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে সবার সাথেই তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন, আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির কার্যানির্বাহী সদস্য শিল্পপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু বলে জানাযায়।

এছাড়াও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এড. আবুল কালাম আজাদ বিশ^াস, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ¦ আতাউর রহমান মুকুল, যুগ্ম সম্পাদক শওকত হাসেম শকু, ফতুল্লা থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আলহাজ¦ মনিরুল আলম সেন্টুসহ আরো কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ ও জাতীয়পার্টির এমপিদের পদলেহনে থাকায় দলের মধ্যে ‘দালাল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করার পাশাপাশি তারা খোদ নিজ দলের নেতাকর্মীদের কাছে ‘শত্রু’ বনে যান।

সর্বশেষ, নারায়ণগঞ্জ জেলার বিএনপি পন্থী আইনজীবীদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নতুন কমিটি কেন্দ্র থেকে ঘোষণা হওয়ার পরেও সদ্য বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এড. তৈমূর আলম খন্দকার নিজ বলয়ের আইনজীবীদের নিয়ে পাল্টা কমিটি গঠন করায়, এখন প্রথম কমিটির আইনজীবীদের কাছে জাতীয়তাবাদী ফোরামের বিভাজনের কারিগর হিসেবে তাদের ‘শত্রু’ বনে গেছেন এড. তৈমূর আলম খন্দকারসহ তার নিদের্শে গঠিত পাল্টা কমিটির আইনজীবীরা।

এছাড়াও গত ১২ অক্টোবর কাশীপুরে বিএনপি দলীয় সমর্থক সন্ত্রাসী মিল্টন ও তুহিন খোদ বিএনপি নেতা মজিদ খন্দকার ও হাসান আহাম্মদের মদদে পরিচালিত সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা খুন হওয়ার ঘটনায়ও মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা মজিদ খন্দকার ও শহর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আহম্মেদ স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘শত্রু’ বনে গেছেন।
আর বিভিন্ন কারনে দলের ভিতরে বিভক্তি সৃষ্টি করে এই শীর্ষ নেতারা এখন নিজেরাই নিজেদের মধ্যে শত্রুতা গড়ে তুলছেন। যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানেই পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে নিজেদের মধ্যকার ‘শত্রুতা’ আরো স্পষ্ট করে তুলছেন।

ফলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’র এ সকল শীর্ষ নেতাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারনে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কড়া মাশুল গুণতে হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দ। তাই আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল ভেদাভেদ শত্রুতা ভুলে গিয়ে শহীদ জিয়ার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। আর তা না হলে হেলায় সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে বসে বসে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here