নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: আওয়ামীলীগ থেকে পদত্যাগ করে নাগরিক ঐক্য নামে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা বনে গেলেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসন থেকে ‘নৌকায়’ চড়ে ফের এমপি নির্বাচিত হয়ে উন্নয়ন করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন উক্ত আসনের সাবেক এমপি এস এম আকরাম।
যিনি বিগত ২০১৪ সালের ২৬ জুন অনুষ্ঠিতব্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ-নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ গ্রহণ করে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের কাছে প্রায় ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তবে এই পরাজয়ের পিছনে এস এম আকরাম বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেন।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল একইদিনে উদ্বোধনের দাবীতে নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে গত ৮ সেপ্টেম্বর শহরের ডিআইটিতে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘২০১৪ সালের ২৬ জুন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ নির্বাচনে ৭২ কেন্দ্রে জালিয়াতি ও কারচুপি করে আমার বিজয় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও আমি ৬৬ হাজার ভোট পেয়েছি যার জন্য আমি নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ। সবাই জানে ওই কারচুপি কিভাবে হয়েছিল কারা করেছিল। তবে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের পথে অতীতেও ছিলাম এখনো আছি।’

এরপর এদিন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে এস এম আকরাম লিখেন, ‘আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছে। আগামীতে বেঁচে থাকলে আমি আবারো নারায়ানগঞ্জ এর জনগনের জন্য কাজ করবো। আমি আবারো আপনাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

জানাগেছে, বিগত ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী আইভীকে দল থেকে সমর্থন না দেয়াসহ বেশ কয়েকটি কারনে আওয়ামীলীগ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন জেলা আহবায়ক ও সাবেক এমপি এস এম আকরাম। যোগ দিয়েছিলেন নাগরিক ঐক্য নামে অরাজনৈতিক একটি সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে।

এরপর ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ গ্রহণ করে জাতীয়পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের কাছে পরাজিত হয়ে গাঁ ঢাকা দেন।

অত:পর আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ইচ্ছে পোষণ করে ফের আওয়ামীলীগে যোগ দিতে চাইছেন নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম।

কিন্তু রাজনীতিবিদসহ সাধারন জনমনে প্রশ্নের উদ্রেগ হয়েছে, মনোনয়ন তো পরের বিষয়, আগে আওয়ামীলীগের সদস্য পদ নতুন করে এস এম আকরাম পাবেন কিনা সেটিই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। কারন সম্প্রতি দলটির সদস্য পদ নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

যেহেতু এস এম আকরাম তৎকালীন সময়ে জেলা আওয়ামীলীগের আহবায়কের পদসহ প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, সেহেতু আগামীতে নৌকার টিকেট পাওয়ার প্রত্যাশা করতে হলেও তাকে আগে দলের প্রাথমিক সদস্য হতে হবে। কিন্তু তিনি যদি সদস্য হতে না পারেন তাহলে আগামীতে নৌকার মনোনয়নে নির্বাচন করাটা শুধুই দু:স্বপ্ন হবে বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

যদিও প্রাথমিক সদস্য পদ চূড়ান্ত না হলেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফের নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসন থেকে নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যাক্ত করে আসছেন এস এম আকরাম। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গ্রীণ সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জানান।

সাবেক এমপি এস এম আকরাম তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘আমাকে ফোন করে অনেকে অনেক প্রকার প্রশ্ন করেন। আমি বলতে চাই ৭৫ এর পর নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনে নৌকার জয় একবার হয়, আর সেই জয় আমি এস এম আকরাম-ই প্রথম মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনার হাতে নৌকার জয় তুলে দেই। বিগত বছর গুলো নারায়ণগঞ্জ ৫ আসন এর আওয়ামীলীগ নেতা কর্মী ও সমর্থকরা নীরব অবহেলার শিকার হয়েছেন। আমি আশা রাখি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ এর সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা তার অবহেলিত নেতা কর্মীর পাশে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ এবার নৌকা প্রতীক হবে নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের জনগণ এর জয়ের মার্কা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।’

তবে এস এম আকরামের আবার হঠাৎ নৌকা প্রীতি দেখে ফেসবুকে অনেকেই মন্তব্য করেন, ২০১৪ সালের জুনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয়পার্টির প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম ওসমানের সাথে পরাজিত হওয়ার পর থেকে এতদিন কোথায় ছিলেন বন্দর নিবাসী আওয়ামালীগের সাবেক এমপি এস এম আকরাম?

প্রসঙ্গত, বিগত ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর আওয়ামীলীগ থেকে পদত্যাগ করেন জেলা আওয়ামীলীগের তৎকালীন আহবায়ক ও সাবেক এমপি এস এম আকরাম। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

সেদিন এস এম আকরাম বলেছিলেন, ‘ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে আমি আহ্বায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। এছাড়া দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও আমি পদত্যাগ করলাম।’

সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের কারণ সম্পর্কে আকরাম বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পর জেলার নেতারা যখন পলাতক ছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে দলের দেখাশোনার ভার দেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে আমি সেই দায়িত্ব পালন করেছি। এটা ছিল বিশেষ চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চাইলে আমাকে হেনস্তা করতে পারত। সেসব জেনেশুনে, সব প্রতিবন্ধকতা, নির্যাতন সহ্য করে ১০ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে সংগঠন চালিয়েছি। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যা হলো তাতে আমি মর্মাহত।’

এস এম আকরাম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে সেলিনা হায়াৎ আইভীর ভাবমূর্তি অনেক ভালো। কিন্তু তাঁকে না দিয়ে এই নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শামীম ওসমানের মতো একজন লোককে। তাঁকে সমর্থন জানাতে কেন্দ্র থেকে অনেক নেতা এসেছেন। কেউ আমার সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করারও চিন্তা করেননি। আমি এতে অত্যন্ত মর্মাহত।’

আকরাম আরও বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের একটি আসন থেকে আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে এই আসনটি মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দলের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিয়েছিলাম। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমি আশা করেছিলাম দল আমার ওপর নতুন কোনো দায়িত্ব দেবে। কিন্তু সেটা তো হয়নি বরং দলের কোনো পর্যায়ে আমার ইচ্ছা প্রকাশের সুযোগও হয়নি।’

সংবাদ সম্মেলনে এস এম আকরাম আরো বলেছিলেন, ‘সর্বশেষ মেয়র নির্বাচনেও আমি আশা করেছিলাম, আমাকে মেয়র পদে নির্বাচনের সুযোগ দেয়া হবে। সে কারণে আমি মনোনয়নপত্রও দাখিল করি। কিন্তু পরে দলের সিদ্ধান্তেই আমি প্রত্যাহার করে নিই। কারন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় নির্বাচন। সেলিনা হায়াৎ আইভীর মতো একজন দলীয় কর্মীকে আমি জেনে-শুনে সমর্থন দিয়েছি। আমার সিদ্ধান্ত যে ভুল হয়নি তা প্রমাণিত হয়েছে। আমার সমর্থিত প্রার্থী জয় পেয়েছে। আমার দল শামীম ওসমানকে সমর্থন দিয়েছিল। তাই আমি মনে করি যে আইভীকে সমর্থন করে নৈতিকভাবে দলের সদস্য থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি। তাই আমি জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এরপর ২০১২ সালের জুনে আওয়ামী লীগ নেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গঠিত নাগরিক ঐক্যে যোগ দেন এস এম আকরাম। যেখানে তিনি অদ্যবধি উপদেষ্টা হিসেবে বহাল আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here