নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ‘অপারেশন হিট স্টর্ম-২৭’ অভিযানে গুলশান হলি আর্টিজান রেঁেস্তারায় বোমা হামলার মাস্টারমাইন্ড কানাডা প্রবাসী তামিম চৌধুরীসহ তিন জঙ্গি নিহত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গি অধ্যায়ের এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের শেষ হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৭ আগষ্ট।
রবিবার (২৭ আগষ্ট ২০১৭) যার একবছর পূর্ণ হতে চললেও থেমে নেই জঙ্গিরা। নারায়ণগঞ্জে নাশকতার লক্ষ্যে এখনো বিভিন্ন ছদ্মবেশে সক্রিয় রয়েছে নব্য জেএমবির সেই তামিম-সারোয়ার গ্রুপের সদস্যরা। তবে এদের দমনে সচেষ্ট রয়েছে প্রশাসন। বিগত একবছরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির প্রায় শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র‌্যাব-১১’র সদস্যরা। উদ্ধার করে পিস্তল, গ্রেনেড, বিষ্ফোরক দ্রব্যসহ জিহাদী বই।

এছাড়াও চলতি বছরের গত ২ জুন গত রূপগঞ্জের পূর্বাচল আবাসিক এলাকার ৫ নম্বর সেক্টরে একটি খালে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান বিষ্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার করে ডিবি ও রূপগঞ্জ পুলিশ।

উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে ছিল, ৬২টি চাইনিজ এলএমজি রাইফেল, ২টি রকেট লঞ্চার, ৪০টি ম্যাগজিন, ৪২টি হ্যান্ড গ্রেনড, ২টি ওয়াকিটকি, ৪টি পিস্ত ও বিপুল পরিমানের গুলি।

এর কয়েকদিন পরে একই স্থানে ফের তল্লাশি চালিয়ে দুই দফায় আরো ১০ টি চাইনিজ রাইফেল, গোলাবারুদসহ প্রায় ৩’শ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ৫জনকে গ্রেফতার সম্ভব হলেও মূল হোতাকে এখনো সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

ফিরে দেখা ‘অপারেশন হিট স্টর্ম-২৭’:

ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি আকরাম সালাউদ্দিনের তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ আগষ্ট মধ্যরাত থেকেই নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার বড় কবরস্থান সংলগ্ন আওয়ামীলীগ নেতার ভাই নুরুদ্দিন দেওয়ানের তিনতলা বাড়ীটি ঘিরে রাখে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখার সদস্যরা। রাতেই পাইকপাড়া জঙ্গি আস্তানায় বসবাসরত ভাড়াটিয়াসহ আশেপাশের লোকজনদের অন্যত্র সরিয়ে দেয় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। বিচ্ছিন্ন করা হয় গোটা এলাকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ।

শনিবার (২৭ আগষ্ট) সকাল থেকেই সেই বাড়ীতে অবস্থানরত গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ তিন জঙ্গিকে আত্মসমর্পনের জন্য একাধিকবার অনুরোধ জানায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

কিন্তু জঙ্গিরা আত্মসমর্পনের আহবানে সাড়া না দিয়ে সব ডকুমেন্ট আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। আল্লাহু আকবর বলে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপসহ গুলি ছুঁড়ে।

এরপর সকাল ৯ টা ২৫ মিনিটে সোয়াট টিমের অংশগ্রহণে শুরু হয় ‘অপারেশন হিট স্টর্ম-২৭’ অভিযান। প্রায় ঘন্টাব্যাপী ¯œাইপার রাইফেলের গুলি বর্ষণে গুলশান হামলার মাস্টামাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ তৃতীয় তলার কক্ষে অবস্থানরত তিন জঙ্গি নিহত হওয়ার পর নিশ্চিত হয়ে ১০ টা ২৫ মিনিটে অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

অভিযানের পর ঘটনাস্থলে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক গুলশান হামলার মাস্টার মাস্টারমাইন্ড তামিমসহ তিন জঙ্গির নিহতের খবর নিশ্চিত করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘জঙ্গিদের মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রমের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়ের শেষ হয়েছে। গুলশান হামলার পেছনে ছিলেন তামিম চৌধুরী। ওই হামলার পরিকল্পনা তার, অর্থায়নও করেছিলেন। তিনি কানাডার নাগরিক। সারা পৃথিবীতে নাশকতা করে বেড়াচ্ছিলেন তামিম চৌধুরী।’

আইজিপি একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘অপারেশন শুরুর আগে আমরা নিশ্চিত হয়েছি জঙ্গি ছাড়া আর কোনো পুরুষ, নারী কিংবা শিশু রয়েছে কি না। নিশ্চিত হওয়ার পরেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। মূল অপারেশন হয়েছে এক ঘণ্টা। অপারেশন শেষে আমরা ভেতরে ঢুকে দেখতে পাই তিনজন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের চেহারা তামিম চৌধুরীর যে ছবি আমাদের কাছে আছে, তার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। নব্য জেএমবির সামরিক শাখার নেতৃত্বে ছিলেন তামিম চৌধুরী। তিনি সিরিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছিলাম। তামিমই গুলশান এবং শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার মূল হোতা। কিছুদিন আগে তার জন্য আমি ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলাম। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাইকপাড়ায় অভিযান চালানো হয়।’

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মো: মনিরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ‘জঙ্গিদের হাতে মোট ৬টি গ্রেনেড ছিল। তামিম চৌধুরীর কাছে ছিল গ্রেনেড। বাকি দু’জনের কাছে অস্ত্র ছিল। সেগুলো কল্যাণপুরে জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ও গুলশানে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের মতো। এগুলো সীমান্ত পার হয়ে অবৈধ পথে আসা অস্ত্রের মতো দেখতে ছিল। জঙ্গিরা দু’টি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটায়। ৪টি নিস্ক্রিয় করা হয়। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একে-২২ রাইফেল ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।’

ঔষুধ ব্যবসায়ী পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল জঙ্গিরা:

জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের মাসখানেক পূর্বে জুলাই মাসে ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবে পাইকপাড়ার বাসাটি মুরাদ ও রানা পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিল জঙ্গিরা বলে জানান, বাড়ির মালিক নুুরুদ্দিন দেওয়ান।

তিনি আরো জানান, ‘জাপান থেকে দেশে ফিরে প্রায় ১৫ বছর আগে তিন-তলা বাড়িটি করেন তিনি। এর দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে তিনি থাকেন। তৃতীয় তলায় উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে মোট দুটি ফ্ল্যাট আছে। এরমধ্যে উত্তর দিকের ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয় জঙ্গিরা। ভাড়া দেওয়ার পর আমি একাধিকবার ওই বাসায় গেছি। গিয়ে দেখেছি, তারা কেউ রান্না করছে, কেউ শুয়ে আছে। কিন্তু একমাসের মধ্যে জঙ্গিদের সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি।’

ভিক্টোরিয়ার পরিবর্তে জঙ্গিদের ময়নাতদন্ত হয় ঢামেকে:

‘অপারেশন হিট স্টর্ম-২৭’ অভিযান শেষ হওয়ার পর পাইকাপাড়ার জঙ্গি আস্তানা থেকে তামিম চৌধুরীসহ তিনজনের লাশ ময়না তদন্তের জন্য প্রথমে নারায়ণগঞ্জ ১’শ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে আনা হয়। কিন্তু ময়নাতদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় পরবর্তীতে জঙ্গিদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়।

এব্যাপারে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস জানিয়েছিলেন, নারায়ণগঞ্জে ময়না তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নাই। যেহেতু ঘটনাটি বেশ স্পর্শকাতর ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কিত সেহেতু নিহতদের ডিএনএ ও নিহত পরিবারের ডিএনএ সংরক্ষণ সহ আলামত সংগ্রহ স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে করতে তিন জঙ্গির লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই তাদের ময়না তদন্ত হবে।’

পাইকপাড়ায় নিহত তিন জঙ্গির মধ্যে অপর দুইজন জঙ্গি হচ্ছেন একজন মানিক (৩৫)। আরেকজন ইকবাল (২৫)। এদের মধ্যে মানিক পাইকপাড়ার ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল।

এদিকে, জঙ্গি আস্তানায় নিহতের ঘটনায় সদর মডেল থানায় পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করে পুলিশ। যা পরবর্তীতে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো অব বাংলাদেশ (পিবিআই) এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ভাড়াটিয়া তথ্য গোপনের অপরাধে গ্রেফতার করা হয় পাইকপাড়ার জঙ্গি আস্তানার বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন দেওয়ানকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here