নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: বুধবার ২৯ নভেম্বর। একাত্তরের এ দিনটি ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য স্বজন হারানোর দিন। ওই দিন ফতুল্লা থানার দুর্গম চরাঞ্চল বুড়িগঙ্গা নদী বেষ্টিত বক্তাবলীতে ১৩৯ জনকে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। স্বাধীনতা যুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে এতো প্রাণের বিয়োগান্তক ঘটনা আর নেই। স্বজন হারানো ব্যাথা ও কষ্ট নিয়ে শ্রদ্ধারদ্ধার সঙ্গে প্রতিবছরই পালিত হয় দিবসটি।
বুধবার (২৯ নভেম্বর) বক্তাবলী গণহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে সকালে সেখানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তর্বক অর্পণ করবেন জেলা প্রশাসনসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন। কিন্তু দিবসটি এলেই নিহতদের স্বজনরা এখানকার বধ্যভূমিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার দাবী তুললেও প্রশাসনের আশ^াস মিলে, অথচ পূরণ হয়নি আদৌ।

জানাগেছে, একাত্তুরের ২৯ নভেম্বর সকালে রাজাকার, আল বদর, শামস বাহিনীর পরামর্শে পাক হানাদাররা ১৩৯ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইন দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। শহীদ হন শাহিদ, ফারুক, অহিদ, মনির, শাহ আলম, রহমতউল্লাহ, শামসুল, আলম, সালামত, খন্দকার, সুফিয়া, আম্বিয়া, খোদেজাসহ ১৩৯ জন।

এদিকে ওই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বর্তমান বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ¦ এম শওকত আলী বলেন, ‘বক্তাবলী গণহত্যা দিবসে প্রতি বছরই বধ্যভূমিটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার দাবী তোলা হয়। কিন্তু আমাদের র্দূভাগ্য, আমাদের দল আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষতায় থাকা সত্ত্বেও আদৌ পর্যন্ত আমরা এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাইনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘যদি বক্তাবলী বধ্যভূমিটি সরকার রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দেন, তাহলে একাত্তুরে এখানে শহীদ ১৩৯ জনের আত্মা যেমন শান্তি পাবে, তেমনি শহীদ পরিবার গুলোর দীর্ঘ বছরের দাবীও পূরণ হবে।’

তৎকালীন ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন রিজভী জানান, তারা মুজিব বাহিনীর অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করে বক্তাবলী ও এর আশপাশ গ্রামে অবস্থান নেন। ওই সময়ে বক্তাবলী গ্রামে এক থেকে দেড়শ’ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এলাকাটিকে নিরাপদ মনে করত মুক্তিযোদ্ধারা। বক্তাবলীতে অবস্থান করেই মূলত মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশনের পরিকল্পনা করত।

তিনি আরো বলেন, ওই এলাকাতে তখন কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত যুগ্ম আহবায়ক মফিজুল ইসলাম, আজহার হোসেন, আবদুর রব, মাহফুজুর রহমান, স ম নুরুল ইসলামসহ আরো অনেকে তখন বক্তাবলীতে অবস্থান করত।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন তথা ২৯ নভেম্বর ছিল প্রচন্ড শীত। সকাল থেকেই ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল পুরো এলাকা। নদী বেষ্টিত হওয়ায় কুয়াশা ছিল অনেক বেশী। ভোরের দিকে হঠাৎ করেই পাক বাহিনী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ঁতে থাকে। অপ্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা জবাব দেয়। পরে মুন্সিগঞ্জ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ব্যাটালিয়ন বক্তাবলীতে এসে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। পরে তারা একত্রে পাক বাহিনীর সঙ্গে প্রায় চারঘণ্টা একটানা যুদ্ধ চালায়। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা মোক্তারকান্দি কবরস্থানের সামনে কয়েকজন রাজাকারকে ধরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যুপরি আক্রমণের মুখে পাক হানাদাররা পিছু হটতে শুরু করে। যাওয়ার আগে তারা রাজাকার, আল বদর, শামস বাহিনীর পরামর্শে তারা ১৩৯ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইন ধরিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এতে নিহত হন শাহিদ, ফারুক, অহিদ, মনির, শাহ আলম, রহমতউল্লাহ, শামসুল, আলম, সালামত, খন্দকার, সুফিয়া, আম্বিয়া, খোদেজা প্রমুখ। পিছু হটার সময় হানাদার বাহিনী একে একে বক্তাবলী পরগনার ২২ গ্রাম পেট্টল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here