নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সরগরম হতে শুরু করেছিল নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন।
বিগত সাড়ে ৪ বছর নারায়ণগঞ্জে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ ব্যতীত বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ছিল অনেকটাই নিস্ক্রিয়। আর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় রাজপথে নেমে অগণিত মামলার শিকার হয়ে দলটির নেতাকর্মীরাও হয়ে পড়েছিলেন বিপর্যস্ত।

কিন্তু আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারো সরব হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গুলো। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণের লক্ষ্যে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল।

গত মাসে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ১০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের সংসদীয় ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দীতাকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দের আগমুহুর্ত পর্যন্ত ভোট উৎসবে মাতোয়ারা সকল দলের নেতাকর্মীদের আচরন সহনশীল পর্যায়ে থাকলেও প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারনা শুরুর পর থেকেই হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠতে শুরু করেছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন।

সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন সহিংস রূপ নিচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। পোস্টার-ফেস্টুন ছিড়ে ফেলাসহ গণসংযোগের সময় প্রার্থী সমর্থকদের গাড়ীবহরে অতর্কিত হামলা, সংঘর্ষ, ভাংচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি দোষারোপের মাধ্যমে ভোটের উত্তাপে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নির্বাচনী সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার শংকা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নির্বাচন কমিশন থেকে প্রতীক পেয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারনায় নামার প্রথম দিন থেকেই ক্ষমতাসীন দল মহাজোটের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচার কাজে বাঁধা প্রদানসহ দলীয় নেতাকর্মীদের উপড় অতর্কিত হামলার অভিযোগ করে আসছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীগণ।

যার মধ্যে, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক দল বিএনপির প্রার্থীদের গণসংযোগের সময় তাদের উপড় মহাজোটের প্রধান শরিক দল আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা একপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়ায় দল দু’টির প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়। এমনকি সুষ্ঠু নির্র্বাচনের লক্ষ্যে চলমান আইনশৃংখলা কমিটির সভাতেই ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীকে মহাজোটের প্রার্থীর সমর্থক ছাত্রলীগ নেতার অতর্কিত হামলার শিকার হতে হয়েছিল।

গত ১১ ডিসেম্বর থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে শুরু হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর এই নির্বাচনী সহিংসতা ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান থাকে।

অথচ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটগণ ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি ইসির কঠোর নির্দেশনা থাকলেও ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এখন বিভিন্ন স্থানে সহিংসার মাত্রাও বাড়তে থাকায় শেষতক নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু হবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে আছেন প্রার্থীসহ সাধারন ভোটারগণ।

১২ ডিসেম্বর সকালে বিএনপির প্রয়াত নেতা বদরুজ্জামান খান খসরু ও ইকবাল হোসেনের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের বিএনপি মনোনীত ঐক্যফ্রন্টের সংসদ সদস্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ।

গণসংযোগের এক পর্যায়ে তিনি আড়াইহাজার থানা বিএনপির কার্যালয় নবরূপে উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের আওয়ামীলীগের বর্তমান সাংসদ ও মহাজোটের প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবু কে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘আপনার নেতাকর্মী ও প্রশাসন দিয়ে হুমকি ধামকি দেওয়া বন্ধ করুন। বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল দল এবং নেতাকর্মীরা ভদ্রলোক তাই তাদেরকে সুশৃঙ্খল ভাবে থাকতে দেন। বিএনপির নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে গেলে কিন্তু পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না।’

আর ঠিক সেদিনই গণসংযোগ শেষে রাতে বাড়ী ফেরার পথে দুবৃর্ত্তদের অতর্কিত হামলার শিকার হন নজরুল ইসলাম আজাদ। হামলার সময় ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও আহত হন বিএনপির প্রায় ১৫ জন নেতাকর্মী।

বুধবার (১২ ডিসেম্বর) দিনব্যাপী গণসংযোগ শেষে নজরুল ইসলাম আজাদের গাড়ী বহর রাতে ফেরার পথে হাইজাদী ইউনিয়নের উদয়ন্দী গ্রামে আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী বর্তমান এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্রসহ সজ্জিত হয়ে অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন আহত একাধিক নেতাকর্মী।

এই হামলায় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আজাদের সাথে গাড়ী বহরে থাকা পনের জন নেতাকর্মী আহত হন। গুরুতর আহত বিএনপি নেতা মোস্তফা ও সুমনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর বাকীরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

হামলায় আহত অন্যরা হলেন, বিএনপি নেতা তোফাজ্জল হোসেন, হৃদয়, জজ মিয়া, নয়ন মিয়া, মাশিকুর রহমান, সরকারী সফর আলী ভূঁইয়া ডিগ্রী কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রানাসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।

এ ঘটনার পর বিএনপি মনোনীত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ অভিযোগ করেছিলেন, আওয়ামীলীগের প্রার্থী সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবুর নির্দেশেই তাঁর অনুসারীরা আমার গাড়ী বহরের উপড় অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। আমার গণসংযোগের প্রথমদিনই ধানের শীষের গনজোয়ার দেখে বাবুর ভীত নড়ে গেছে। তাই বাবুর নির্দেশে যুবলীগ ক্যাডার বিপ্লবের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্রসহ সজ্জিত হয়ে কয়েকশ স্থানীয় ও বহিরাগত সন্ত্রাসী এই অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। দশটি গাড়ী ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলায় বিএনপির ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত দুই জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে আর বাকীরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

তিনি আরো বলেছিলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সরকার দলীয় এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর নির্দেশে এই ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সুবিচার প্রার্থনা করছি। সেইসাথে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবী জানাচ্ছি।

কিন্তু আইনশৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সুবিচার প্রাপ্তির পূর্বেই পুনরায় তারপর দিনই প্রচারনায় বেরিয়ে আবারো হামলার শিকার হন নজরুল ইসলাম আজাদ।

বৃহস্পতিবার (১৩ ডিসেম্বর) আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে।
এসময় আওয়ামীলীগ-বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে ১৫ জন আহত হন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে বিএনিপর প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ দলীয় নেতা কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারনায় বের হন। একই সময়ে আওয়ামীলীগের লোকজনও নির্বাচনী প্রচারনা শুরু করেন। তখন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রচারনায় বাঁধা দিলে তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধেঁ যায়।

এই ঘটনায় বিএনপির সায়েম, মামুন, রাসেল, সাইদুল্লাহ, আউয়াল, সিফাতসহ ১৫ জন আহত হন।

আর এই ঘটনার পর তাৎক্ষনিক সংবাদ সম্মেলন করে তীব্র প্রতিবাদ জানান, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামীলীগের এমপি বাবুর নির্দেশেই আজাদের গাড়ীসহ ২টি গাড়ী ভাংচুর করা হয়েছে।

তবে আজাদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামীলীগ মনোনীত মহাজোটের প্রার্থী আলহাজ¦ নজরুল ইসলাম বাবু বলেছেন, বিএনপির অভ্যন্তরীন দ্বন্দের কারণেই এই হামলা হয়েছে। এতে আমাদের কোন কর্মী জড়িত নাই।

অবশ্য ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: আকতার হোসেন পরিস্থিতি শান্ত থাকার দাবী করেন।

অপরদিকে, একইদিন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতেই নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের বিএনপি মনোনীত ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আলহাজ¦ আজহারুল ইসলাম মান্নানের উপড় অতর্কিত হামলা চালিয়েছেন মহাজোটের প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির এমপি আলহাজ¦ লিয়াকত হোসেন খোকার অনুসারী সোনারগাঁ পৌর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রনি বিল্লাহ।

বৃহস্পতিবার(১৩ ডিসেম্বর) বিকেলে সোনারগাঁয়ের উপজেলা পরিষদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে মিটিং চলা অবস্থায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও সোনারগাঁ থানার ওসির সামনেই এ হামলা চালানো হয়।

এই ঘটনায় তাৎক্ষনিক ছাত্রলীগ নেতা রনি বিল্লাহকে আটক করে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে তাকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন সোনারগাঁ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট বি এম রুহুল আমিন রিমন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মোরশেদ আলম জানান, উপজেলা পরিষদের ভেতরে নির্বাচনী আচরণবিধির বিষয়ে ইউএনও, আমি, নির্বাচন অফিসারসহ আমরা সবাই মিটিংয়ে ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ করেই রনি বিল্লাহ দৌঁড়ে এসে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের পাঞ্জাবীর কলার ধরে টেনে নিচে নামিয়ে ফেলেন। এরপর পুলিশ তাৎক্ষনিক রনিকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট তাকে তিন মাসের কারাদন্ড প্রদান করেন।

এরআগে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে (সোনারগাঁ) বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের নির্বাচনী পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে।

বুধবার (১২ ডিসেম্বর) রাত ১২ টায় সোনারগাঁ পৌরসভা ও বৈদ্দরবাজার এলাকার বিভিন্ন স্থানে এই ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, এই আসনের বর্তমান সাংসদ ও মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকার ভাগ্নে বাবু ও অপুর নেতৃত্বে প্রায় ৪০/৫০ জনের একটি সশস্ত্রবাহিনী ধানের শীষ প্রতীক সংবলিত পোস্টার ছিঁড়ে এই ন্যাক্কারজনক তান্ডব চালায়।

এ ব্যাপারে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা বলেন, নির্বাচনে নিশ্চিত ভরাডুবি জেনে বিনা ভোটের সাংসদের সাঙ্গপাঙ্গরা এ হামলা চালিয়েছে। তবে ধানের শীষের গণজোয়ার কেউই থামাতে পারবে না।

তবে বিএনপি মনোনীত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও তাঁর কর্মী সমর্থকদের অভিযোগের সত্যতা জানতে সোনারগাঁয়ের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মুঠোফোনে সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আর একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে প্রথম রাজনৈতিক সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ-১ আসন রূপগঞ্জে।

প্রার্থীর পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ-বিএনপির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কমপক্ষে ১৭ জন কর্মী সমর্থক আহত হন। এছাড়াও সংঘর্ষকালে একপক্ষ আরেক পক্ষের লোকজনের বাড়ীতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ১২ ডিসেম্বর বুধবার দুপুরে উপজেলার রূপগঞ্জ সদর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনীত ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনিরের সমর্থিত ছাত্রদল নেতা সোহেল, এমদাদ, মোমেন সহ ১৫ থেকে ২০ জন নেতাকর্মীরা দুপুর ১২টার দিকে রূপগঞ্জ সদর এলাকার কাজী আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে পোস্টার লাগাতে যায়। এসময় পোস্টার লাগানোর খবর পেয়ে আওয়ামীলীগ মনোনীত মহাজোটের প্রার্থী ও বর্তমান এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর সমর্থিত ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি মশিউর রহমান রিপনসহ তার লোকজন কাজী মনিরের লোকদের বাধা দেয়।

এনিয়ে উভয়পক্ষের লোকজনের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে।

সংঘর্ষে সোহেল, সাগর, এমদাদ, মোমেন, খলিল, আসলাম, মানিক, আলামিন, তোফাজ্জল হোসেন, রফিকুর ইসলাম, পিস্টন রাসেলসহ উভয়পক্ষের অন্তত ১৭ কর্মী সমর্থক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদল নেতা সোহেল, মোমেন, খলিল ও মানিকের বাড়ীতে আর বিএনপির কর্মী সমর্থকরা ছাত্রলীগ নেতা পিস্টন রাসেলের বাড়ীতে হামলা চালায়। এসময় ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগ করেন উভয়পক্ষের লোকজন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

আহতদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা দেয়া হয়।

এই ঘটনার ব্যাপারে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, আমি এই হামলা ও বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়ীঘরে লুটপাটের তীব্র প্রতিবাদের পাশাপাশি আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসীদের শাস্তি দাবী করছি। নির্বাচন কমিশন মুখে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বললেও বাস্তবে ঘটছে উল্টো ব্যাপার। আমাকে কোথাও প্রচারনা চালাতেই দিচ্ছে না। পাশাপাশি গ্রেফতার নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপড়। প্রশাসন-নির্বাচন কমিশন সবাই আরেকটি পাঁতানো নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এবার তাদের সেই ষড়যন্ত্র আর বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না। এজন্য শহীদ জিয়ার প্রতিটি কর্মী গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের জন্য পুর্ণ প্রস্তুত আছে।

এব্যাপারে ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি মশিউর রহমান রিপনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিএনপির লোকজন পোস্টার লাগানোর সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে তাদের দেখে বিএনপির কর্মীরা উস্কানীমূলক মন্তব্য করে। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে।

এরপর আবার রূপগঞ্জে ১৩ ডিসেম্বর রাতে আওয়ামীলীগের প্রার্থী সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজীর একটি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ করে তাদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবীতে শুক্রবার (১৪ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় রূপসী-কাঞ্চন সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আওয়ামীলীগের কর্মী সমর্থকরা।

ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান দাউদ হোসেন মোল্লার অভিযোগ, বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার ভুলতা ইউনিয়নের হাটাব জেলেপাড়া এলাকার একটি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করে স্থানীয় বিএনপির কর্মীরা। এ সময় বাজারের পাহারাদার এগিয়ে এলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। ক্যাম্পে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রীর ছবি, টেলিভিশন ও আসবাব ভাংচুর করে সেগুলো বাইরে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

তাছাড়াও, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা ও আওয়ামীলীগের সাবেক এমপি এস এম আকরামের নির্বাচনী প্রচারণায় দুর্বৃত্তের হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ক্ষমতাসীন জোটের স্থানীয় এমপি সমর্থিত লোকজন এ হামলা চালিয়েছে। তবে এ ঘটনায় কেউ আহত না হলেও প্রচার সামগ্রী ভাঙচুর করা হয়েছে বলে দাবী করেছেন আকরামের সমর্থকরা।

গত ১১ ডিসেম্বর বিকেলে বন্দরের মদনগঞ্জ এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি মৌখিকভাবে বন্দর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এস এম আকরাম।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি মেনেই মঙ্গলবার সকাল থেকে আমার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। আমি নিজেও কয়েকটি স্থানে গণসংযোগ করে এসেছি। কিন্তু বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ আমার প্রচারকাজে ব্যবহৃত একটি মাইক মদনগঞ্জ এলাকায় প্রবেশ করলে কয়েকজন দুর্বৃত্ত আমার মাইকের সঙ্গে থাকা কর্মীকে মারধর করে। এ সময় মাইক ভেঙ্গে ফেলে তারা।

এস এম আকরাম আরও জানান, দুবৃর্ত্তদের আমরা শনাক্ত করতে না পারলেও ধারণা করা হচ্ছে এটা ক্ষমতাসীন এমপির (জাতীয় পার্টির মনোনীত মহাজোটের প্রার্থী সেলিম ওসমান) সমর্থকদের কাজ। এ ঘটনায় আমি কেনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের না করলেও বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবগত করেছি।

তবে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এস এম আকরামের এক কর্মী তাকে ফোনে বিষয়টি জানানোর পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হলেও সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অদ্যবধি কোন ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা না ঘটলেও উক্ত আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী জেলা জমিয়তে উলামায়ে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা সভাপতি মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে জঙ্গি মতবাদের প্রার্থী দাবী করে আওয়ামীলীগের মনোনীত মহাজোটের প্রার্থী আলহাজ¦ এ কে এম শামীম ওসমান সাম্প্রতিক সময়ে রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জে হঠাৎ জঙ্গিদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বেশ কয়েকদিন যাবত নিজ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে উঠান বৈঠকে বক্তব্যকালে শামীম ওসমান দাবী করে আসছেন, আমার বিরুদ্ধে যে নির্বাচনে খাড়াইছে তারে আমিই খুইজ্জা পাইনা। তার বাড়ী কই, কই থাকে, তারে আমি খুঁজি আর ঁখুজি পাই না। তবে শুনতাছি নির্বাচন করার জন্য সে আসে নাই, আসছে নাকি অন্য উদ্দেশ্য নিয়া। গত ৪ থেকে ৫ দিন নারায়ণগঞ্জের চারপাশে জঙ্গীদের, শিবিরের ও জামায়াতের আনাগোনা বেড়ে গেছে এবং ঢাকা থেকে নাকি জঙ্গীরা আসে। উদ্দেশ্য কি? রাত বিরাতে আসে কেন? জঙ্গী হামলা করবেন? আমাকে আবার মারার চেষ্টা করবেন? ১৬ জুনের মতো বোমা হামলা করবেন, ২১শে আগষ্টের মতো ঘটনা ঘটাবেন, ঘটনা, মালিক তো আল্লাহ। বাঁচানোর মালিক আল্লাহ এবং নেয়ার মালিকও আল্লাহ।

গত ১২ ডিসেম্বর সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নে নির্বাচনী উঠান বৈঠকে বক্তব্যকালে নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনের প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারন করে শামীম ওসমান আরও বলেছেন, এইবারের নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, জঙ্গীরা কি করবে আমি জানি। নির্বাচনকে বানচাল করতে বিএনপি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জঙ্গী মতবাদের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে ইতোমধ্যে রাজধানী থেকে জামাত শিবিরের অর্ধশত জঙ্গি নারায়ণগঞ্জে এসে ঘাঁটি করছে। নারায়ণগঞ্জের আনাচে কানাচে তারা অবস্থান নিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে তারা জঙ্গি কানেকশনে কাজ করছে। তাই প্রশাসন কে বলছি, গোফে তাও দিয়ে বসে থাকবেন না। আপনারা যদি এই জঙ্গীদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা না নেন, না পারেন, বলেন। তাহলে জনগণকে নিয়েই এই জঙ্গীদের প্রতিহত করবো। আর ছাড় দেওয়া হবে না। জনগনকে সাথে নিয়ে জঙ্গীদের প্রতিরোধ করার সেই ক্ষমতা আমাদের আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here