নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ডিএনডিবাসীর দূর্ভোগ দেখানোর জন্য খাবারের ডাইনিং টেবিল থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ ফ ম মোস্তফা কমালকে উঠিয়ে ডিএনডি এলাকায় নিয়ে এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান।
যার প্রেক্ষিতে ডিএনডিবাসীর দূর্ভোগ উপলব্ধি করতে পেরে একনেকে সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা প্রকল্প বরাদ্দ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আর দু’বছর পর ডিএনডিবাসীর দূর্ভোগের কথা চিন্তা করে এখন পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে ফোন করে কথা বলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। কিন্তু ফলাফল লোক দেখানো বলে মন্তব্য করেন ডিএনডির জলাবদ্ধ মানুষেরা।

জানাগেছে, ১৯৬২ সালে ইরি ধান চাষের জন্য ৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমি নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ তৈরি করা হয়। ৩২ দশমিক ৮ কিলোমিটার বাঁধ এলাকার ভেতরে ৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন।

শুরুতে বাঁধ এলাকার ভেতরে পাঁচ হাজার ৬৪ হেক্টরে সেচ প্রকল্প ছিল। পানি প্রবাহের জন্য ছিল কংস নদ এবং নলখালী খালের মতো ৯টি জলাশয় এবং আরও ৯টি শাখা খাল। এ ছাড়া ছিল আরও ২১০টি আউটলেট ও ১০টি নিষ্কাশন খাল। সব মিলিয়ে ১৮৬ কিলোমিটার ছিল খালের দৈর্ঘ্য। এগুলো ডিএনডির ইরিগেশন প্রজেক্টে সেচ খাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব খালের বেশিরভাগই দখল-দূষণে বিলুপ্ত। হারিয়ে গেছে কংস নদও। পানি প্রবাহের পর্যাপ্ত বন্দোবস্ত না থাকায় জলাবদ্ধতার বিপত্তি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে।

 

ডিএনডি বাঁধ এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, আশির দশকে বাঁধের ভেতর জমি কিনে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর ও শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণ শুরু করেন অনেকে। প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি না থাকায় খাল দখল ও ভরাট করেও স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। এতে পানি প্রবাহের মাধ্যম বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে অভিশাপের মতো চেপে বসেছে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি। অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটুপানিতে তলিয়ে যাচ্ছে সব।

২০১৫ সালে ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১০০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খালের ৩৯ কিলোমিটারের আবর্জনা পরিষ্কারে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। সেই টাকা ফুরিয়েছে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে গিয়েই। দুই বছর আগে ডিএনডির সব খাল ও দখলদারদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেন নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা। কিন্তু সে নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো উদ্যোগ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এরপর ২০১৫ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রীকে নিয়ে ডিএনডি এলাকা পরিদর্শন করেন স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমান। তারা স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতিও শোনান। পরের বছর ডিএনডি সেচ প্রকল্প এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার।

তাই সম্প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সাংসদ শামীম ওসমান বলেন, ‘এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ডিএনডির লাখো মানুষের দুর্ভোগের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী একনেকের মিটিংয়ে এজেন্ডা না থাকা সত্ত্বেও ডিএনডির ওই বিশাল বাজেট বরাদ্দ দিয়েছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল দুই বছর আগে দুপুরের খাবার না খেয়ে জনগণের দুর্ভোগ দেখার জন্য ডিএনডি এলাকায় ছুটে এসেছিলেন।’

কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পর ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। বরং আরও একাধিক স্থানে নিষ্কাশন পাম্প বিকল হয়ে পড়েছে। ফলে কয়েক দফা বৃষ্টিতেই ডিএনডির নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বসত বাড়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ স্কুল-কলেজে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

আর তাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা তথা ডিএনডি বাঁধের ভিতরে অল্প বৃষ্টিতেই সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য গত ২৮ আগষ্ট পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সঙ্গে কথা বলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী।

মেয়র আইভী বলেন, ‘ডিএনডি বাঁধের জলাবদ্ধতায় দীর্ঘদিন ধরে মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। তাই এ সমস্যা সমাধানের জন্যই মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে মুঠোফোনে কথা বলি।’

কারন মেয়রের নির্বাচনী এলাকার ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছে উক্ত ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দারা।

এদিকে ডিএনডি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মানুষের দুর্ভোগ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পুরো ডিএনডির এমন কোনো এলকা নেই যেখানে পানি নেই। পুরো ডিএনডি এখন একটি বিশাল হাওরে পরিণত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। নিচতলা পানির নিচে। যান চলাচল বন্ধ। ময়লা ডাইং বর্জ্য কেমিক্যালের পানি মিশে একাকার। দুর্গন্ধে মানুষ অতিষ্ঠ। স্থানীয়রা ডিএনডিকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

পাউবো সূত্র জানায়, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। যা শেষ হতে প্রায় ৩ বছর সময় লাগবে। প্রকল্পের আওতায় শিমরাইল ও আদমজীনগরে ২টি পাম্প স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুরে ৩টি পাম্পিং প্ল্যাান্ট নির্মাণ করা হবে। এর বাইরে ডিএনডি এলাকার বিভিন্ন স্থানে ৭৯টি কালভার্ট, ২টি ক্রস ড্রেন, ১২টি আরসিসি গার্ডার ব্রীজ নির্মাণ ও ৫২টি বিদ্যমান ব্রীজ ও কালভার্ট মেরামত করা হবে। শিমরাইল, আদমজীনগর, পাগলা, শ্যামপুর ও ফতুল্লা পাম্প স্টেশন বা প্ল্যান্টের কমান্ড এরিয়ায় ৯৩.৯৮ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন, ৩২ হাজার ৫০০ ঘনমিটার অতিরিক্ত সংযোগ খাল পুনঃখনন ও ৯৩.৯৮ কিলোমিটার পুনঃখননকৃত খালের তীর উন্নয়ন করা হবে। ১৩.৫০ কিলোমিটার হেরিংবোন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে প্রকল্পের আওতায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here