নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও এড. খোকন সাহাকে সাধারন সম্পাদক করে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয় ।
তার দীর্ঘ দুই বছর তিন মাস পর ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু বিনা কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার প্রায় ৪ বছর অতিক্রম করলেও মহানগর আওয়ামীলীগকে সুসংগঠিত করার পরিবর্তে নানা ইস্যুতে বিতর্কিতই করেছেন সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন ও সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা।

একের পর এক তাদের নিজ স্বার্থ হাসিলের কাজের জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। সাম্প্রতিক নানা ইস্যুতে তাদের দলের বেঈমান হিসেবে আখ্যায়িত করে দল থেকে তাদের বহিস্কারের দাবীও করেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দ।

জানাগেছে, মহানগর আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব পাওয়ার পর দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে পেয়েছিল আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা।

গত ২০ মে গণভবনে আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ণ কার্যক্রম উদ্বোধন করার পর প্রায় ২৫ হাজার নতুন সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সদস্য সংগ্রহ অভিযান পরিচালনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ২৭ টি ওয়ার্ডে আহবায়ক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মহানগর আওয়ামীলীগ।

কিন্তু আহ্বায়ক কমিটি গঠন তো দূরের কথা, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি সাধারন সম্পাদকের বিরুদ্ধে উল্টো বন্দর থানাধীন ৯টি ওয়ার্ডে ‘হাইব্রীড’ জাতীয় নেতাদের কাছে ‘চুপিসারে’ নতুন সদস্য সংগ্রহ করণে বই প্রদানের অভিযোগ করে তৃণমূল আওয়ামীলীগ।

তন্মধ্যেই গত ৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ঢাকা বিভাগীয় যুগ্ম সম্পাদক ডা: দিপু মনি এমপিকে প্রধান অতিথি করে মহানগর আওয়ামীলীগ আনুষ্ঠানিক ভাবে দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম উদ্বোধন করার আয়োজন করলেও পরবর্তীতে অনিবার্য কারন বশ:ত সেই অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে যায়।

এরপরেও তৃণমূল নেতৃবৃন্দরা প্রত্যাশা করেছিলেন, দেরীতে হলেও আনুষ্ঠানিক ভাবেই দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহ ও সদস্য নবায়ণ কার্যক্রম হয়তো বা শুরু করবে মহানগর আওয়ামীলীগ, কিন্তু সেটির পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক ভাবেই ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বই বিতরন করে ‘চুপিসারে’ দলীয় সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করে দেয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দ।

বিশেষ করে, বন্দর থানাধীন সিটির ৯ টি ওয়ার্ডে প্রকৃত নেতাদের কাছে বই বিতরন না করে ‘হাইব্রীড’ জাতীয় নেতাদের কাছে সদস্য সংগ্রহের বই দেয়ায় মহানগর আওয়ামীলীগের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতার বিরুদ্ধে রীতিমত প্রতিবাদ সভাও করে ফেলেছেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দরা।

গত ২২ অক্টোবর বিকেলে নাসিক ২৩ নং ওয়ার্ড নবীগঞ্জে মহানগর আওয়ামীলীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর মৃধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে এম এ রশীদ মহানগর আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের এহেন কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘বন্দরে ৯টি ওয়ার্ডের দায়িত্বশীল নেতাদের না জানিয়ে ‘হাইব্রীড’ নেতাদের কাছে সদস্য সংগ্রহ বই তুলে দেওয়ার ঘটনায় বেশ মর্মাহত হয়েছে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা। মহানগরের দায়িত্বশীল কতিপয় নেতা’র এমন আচরণের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এনিয়ে যদি কোন উদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এর দায়ভার মহানগর আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে।’

তবে তৃণমূলের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা উল্টো দাবী করেন, ‘বন্দর থানা আওয়ামীলীগ সভাপতি হচ্ছেন জেলা আওয়ামীলীগের অধীন। তাই তিনি নাকি মহানগর আওয়ামীলীগ নিয়ে কোন কথা বলার এখতিয়ারই রাখেন না।’

সর্বশেষ বিএনপি জামায়াত সমর্থিত হাইব্রীড জাতীয় নেতাদের হাতে সদস্য সংগ্রহ ফরম তুলে দিয়ে খোদ দলীয় কার্যালয়েই মহানগর আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দদের তোপের মুখে পড়েন আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা।

গত ১০ অক্টোবর শহরের ২নং রেলগেটস্থ দলীয় কার্যালয়ে মহানগর ২৩, ২৪, ২৬ ও ২৭ নং ওয়ার্ড নেতাদের হাতে সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা দলীয় নতুন সদস্য ফরম তুলে দেয়ার পরপরই মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হুমায়ূন কবির মৃধা, বন্দর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন আনু, সাবেক সাধারন সম্পাদক সামছুজ্জামান, ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান শামীম ও ভুলুসহ বেশকিছু নেতা-কর্মী সাব কমিটিতে স্থান পাওয়া নেতা শহীদুল্লাহকে বিএনপি নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এসময় আরেকটি অংশ হাবিবুর রহমান শামীমকে রাজাকারের নাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে। এরপরই শহিদুল্লাহর পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দু’টি পক্ষ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতাদের সামনেই বিরোধে জড়িয়ে পরে। বিরোধ এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়ার উপক্রম হলে অন্যান্য নেতাদের হস্তক্ষেপে একটি পক্ষ কার্যালয় ত্যাগ করেন। আর এই ঘটনাকে তুচ্ছ বলে হাসিমুখে উড়িয়ে দেন খোকন সাহা।

এরআগে, এই দলীয় সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়েও প্রতারনার আশ্রয় নিয়েছিল মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন। মহানগরের ২৭ টি ওয়ার্ডে মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার নতুন সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যে ফরম থাকলেও আনোয়ার হোসেন বড় হওয়ার স্বার্থে ৪ লাখ নতুন সদস্য সংগ্রহ করা হবে বলে জানান। কিন্তু বাস্তবে যা ছিল নিছকই মনগড়া গল্প।

শুধু সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেই নয়, এর আগে দলীয় সাংগঠনিক ‘সীমানা’ ইস্যুতে জেলা আওয়ামীলীগের সাথে বিরোধে জড়িয়ে একপর্যায়ে দাবীকৃত বন্দর উপজেলাধীন ৫টি ইউনিয়ন নাকি কেন্দ্র থেকে মহানগর আওয়ামীলীগকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে মর্মে স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে ‘ছলচাতুরি’র আশ্রয় নেয় আনোয়ার হোসেন এবং খোকন সাহা। পরবর্তীতে গত ৩০ জুলাই জেলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে দলীয় সদস্য সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধনীতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ‘ছলচাতুরি’র আশ্রয় নেয়া আনোয়ার খোকনের হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দিয়ে যান কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ঢাকা বিভাগীয় যুগ্ম সম্পাদক ডা: দিপু মনি এমপি।

তিনি সাফ জানিয়ে দেন, মহানগর আওয়ামীলীগের সীমানা কেবল মাত্র মহানগরীর ২৭ টি ওয়ার্ডই। তার বাহিরে যা আছে সব জেলার অধীন।

এরপর ‘সীমানা’ ইস্যুতে ‘ছলচাতুরি’র আশ্রয় নেয়ার কারনে দলীয় নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা।

তাছাড়াও যুব মহিলালীগের কমিটি গঠন ইস্যুতে সাংসদ শামীম ওসমানের সাথে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়ে তৃণমূলে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা। তাদেও মুখে শামীম ওসমান বিরোধী আচরনের কারনে আগুন জ¦লে যায় আওয়ামীলীগসহ অঙ্গসংগঠনে। ক্ষোভে ফুঁসে দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মন্তব্যের ঝড় তুলেন। আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহাকে দলের মধ্যে থাকা বেঈমান আখ্যায়িত করে তাদের দলকে থেকে একঘরা করারও দাবী উঠে তৃণমূলে।

তন্মধ্যে, গত ১৭ জুলাই খোকন সাহা ও মাহমুদা মালা ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়কে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে ফের দ্রোহের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়।

এছাড়াও দেখাগেছে, দলীয় কোন কর্মসূচী করতে গেলেও আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা তেমন লোকসমাগম ঘটাতে পারেন না। রীতিমত তারা হয়ে পড়েছেন কর্মী শূণ্য। যার ফলে তাদের উপড় এখন আর আস্থা রাখতে পারছেন বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমীল নেতৃবৃন্দ।

তৃণমূলের দাবী, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে ব্যস্ত আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহার হাতে মহানগর আওয়ামী লীগ এখন নিরাপদ নয়। তারা ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ হয়ে গেছেন।

তাই শীঘ্রই দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কারো হাতে মহানগর আওয়ালীগের দায়িত্ব ভার অর্পণের দাবী জানিয়েছে তৃণমূল নেতৃবৃন্দ। নতুবা কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারির বিতর্কিত কর্মকান্ড একসময় দলের জন্য শংকার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মন্তব্য করছেন তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here