নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: সোনারগাঁ উপজেলার খৈতারগাও গ্রামে শুশ্বর বাড়িতে নির্মমভাবে খুন হওয়া গৃহবধু কণিকার হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবীতে মানববন্ধন করেছে নিহত কণিকার পরিবার ও এলাকাবাসী।
বৃহস্পতিবার (১০ আগষ্ট) সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে অংশ নেয়া নারী-পুরুষ সকলেই দ্রুত আসামীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী জানান। মানববন্ধনে খুন হওয়া কণিকার মা রিনা আক্তার জানান, আমার স্বামী সামান্য একজন গাড়ী চালক। ২০১৬ইং সালের ৮ মে আমার মেঝ মেয়ে কণিকাকে সোনারগাঁ উপজেলার খৈতারগাও গ্রামের গুলজার হোসেনের বড় ছেলে কুয়েত প্রাবসী বিপুলের সঙ্গে বিয়ে দেই। বিয়ের তিন মাস পর বিপুল কুয়েত চলে যান। শুরুর দিকে শ^শুর বাড়ীতে ভালই চলছিল কণিকার জীবন কিন্তু মেয়ের জামাই বিপুল বিদেশ যাওয়ার পর থেকে জামাইয়ের ছোট ভাই দেবর জাহাঙ্গীর কণিকাকে আপত্তিকর প্রাস্তাব দেয়। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কণিকা আমাকে ফোন করে জানায়। জাহাঙ্গীর কণিকাকে কুপ্রস্তাব দিচ্ছে। সে রাজি না হওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। বিষয়টি বিদেশ থাকা বিপুলকে জানালে শ^শুর বাড়ীর লোকজন আরো ক্ষেপে গিয়ে কণিকার উপর নানা অজুহাতে দুর্ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

তিনি আরো বলেন, গত ২০ জুন আনুমানিক বিকাল ৬ টার দিকে কণিকার দেবর জাহাঙ্গীর ফোন করে আমাকে জানায়, কণিকা পাগলামী করছে আমি কিন্তু বিপুল না আমি জাহাঙ্গীর এসব সহ্য করবো না। তাকে যেন গিয়ে নিয়ে আসি। পরে রাত আনুমানিক ৯:৩০ মিনিটের দিকে ফোন করে জাহাঙ্গীর আমাকে জানায় কণিকার অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাকে দেখতে হলে এখনি যেন আমরা চলে আসি। আমরা সাথে সাথে জাহাঙ্গীরের চাচী শামসুন্নাহারের মোবাইল ফোনে ফোন করে জানতে চাই কণিকার কী হয়েছে? সে আমাদেরকে বলে, কণিকা বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। তার কোন হুশ নেই। মেয়েকে দেখতে হলে এখনি আসেন।

জবাবে আমি বললাম, আপনারা ডাক্তার আনছেন? সে আমাকে বলেছিল; ডাক্তার, কবিরাজ সবই এনেছি। ঐদিন রাত ১ টার দিকে আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে নিয়ে কণিকার শ^শুর বাড়িতে গিয়ে দেখি কণিকার লাশ পড়ে আছে মেঝেতে। মুখমন্ডলে, গলায়, পিঠে, বুকে, হাতে, পায়েসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কামড় ও খামছিসহ মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। বাড়ির লোকজন পালিয়ে গেছে। সোনারগাঁ থানায় খবর দিলে তখন ঘটনাস্থলে আসেন এসআই আপন কুমার মজুমদার। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে যায়। মেয়ের লাশ পড়ে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মারের দাগ ও ক্ষত চিহ্ন ছিল। গলায় কাটা দাগ ছিল। আমাদের কাছে লাশের ভিডিও ফুটেজ ও ছবি রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, খুন করে পালানোর সময় এই হত্যা মামলার আসামী রেজওয়ানকে আটক করে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা। গত বুধবার এই মামলার তদন্ত করতে আসেন ক্রাইম তদন্ত এসপি মতিউর রহমান। তখন প্রথমেই জিজ্ঞেস করা হয় জাহাঙ্গীরের চাচী শামসুন্নাহারকে। আপনি প্রথমে কী দেখলেন? তখন সে অগুছালো কিছু মিথ্যা কথা বলেছিল। তাই ক্রাইম তদন্ত এসপি মতিউর রহমান শামসুন্নাহারকে বলেছিল, একেক সময় একেক কথা বলছেন কেন। তারপর জিজ্ঞসাবাদ করা হয় শামসুন্নাহারের কণ্যাকে, জিজ্ঞাসাবাদে বেড়িয়ে এলো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। খুনি জাহাঙ্গীর কিভাবে একটি কিশোরী মেয়েকে দিয়ে খুনের পরে কি জানি তেল আর পানি দিয়ে যখমের দাগগুলো মুছে ফেলার জন্য মালিশ করিয়েছিলেন বলে মেয়েটি স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। পরে ঘটনার স্থান ও ভিডিও ছবিগুলো দেখে ক্রাইম তদন্ত এসপি মতিউর রহমান বলেন, প্রায় একই ধরনের কেইস আমি একাধিক তদন্ত করেছি। আত্মহত্যাকারী কখনো নিজের গলা কাটতে পারেনা। তিনি আমাদেরকে ন্যায় বিচারের আশ্বাস দেন এবং বর্তমান মামলা তদন্তকারী এসআই আবুল কালাম আজাদকে এসপি মতিউর রহমান বলেছিলেন, ওখানে আত্মহত্যার কোন সিমটম পাওয়া যায়নি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই খুনের ক্লু উদঘাটন করুন, জাহাঙ্গীরসহ অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতার করুন। মামলার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা আপন কুমার মজুমদার মামলা নেওয়ার সময় ৫,০০০ টাকা ও আসামী ধরার সুসংবাদে ৩,০০০ টাকা নেয়। আমি অত্যন্ত গরীব মানুষ। এরমধ্যে শুনতে পাচ্ছি আমার মেয়ে কণিকার ময়না তদন্ত রিপোর্ট নাকি হত্যার পরিবর্তে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। ময়না তদন্তে নাকি এমন রিপোর্ট করাও হয়েছে। কিন্তু আমার মেয়ে কণিকাকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আমার মেয়ের শরীরের সেই ক্ষত চিহ্ন ও লাশের ভিডিও আমার স্বজনরা সংরক্ষণে রেখেছিল। এসময় তিনি পুলিশ ও ময়নাতদন্তের সাথে জড়িত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, এত সব আঘাতের চিহ্ন থাকার পরও ময়না তদন্তে কিভাবে কণিকার আত্মহত্যা রিপোর্ট আসে। আমার কাছে পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টের প্রতিবেদন রয়েছে। রিনা আক্তার বলেন, বিভিন্ন লোক মারফত জানতে পেরেছি, মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আপন সুরত হাল রিপোর্টে কোন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। যার ফলে তার যোগসাজোশে এ রিপোর্ট ঘোরানো হয়েছে বলে ধারণা করছি। রিনা আক্তারসহ মানববন্ধনে অংশ নেয়া সকলেই জেলা পুলিশ সুপারসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের দাবী জানান।

উল্লেখ্য, গত ২০ জুন রাতে শ্বশুর বাড়িতে খুন হয় কণিকা। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে যায়। পরে নিহত কণিকার মা রিনা আক্তার বাদী হয়ে কণিকার দেবর জাহাঙ্গীরসহ একাধিক ব্যাক্তির নাম উল্লেখ করে সোনারগাঁ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে ঘঁটনার প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যায় নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here