নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জে রাজউকের কর্মকান্ড নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।
মঙ্গলবার (৮ আগষ্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় নগর ভবনে রাজউক এর ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫ইং) (ড্যাপ) এর বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারনের সাথে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেয়র।

সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অনিবার্য কারনে আসতে না পারায় তার স্থলে উপস্থিত হন রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো: সিরাজুল ইসলাম।

আইভী বলেন, ‘আপনারা টাকা নিয়ে সরকারি খালের উপড় বাড়ীঘর নির্মানের অনুমোদনা দিচ্ছেন আর আমরা টাকা খরচ করে সেগুলো উচ্ছেদে ব্যবস্থা নিব তা হবে না। নগরীতে ভবন নির্মাণে সাধারণ মানুষের মাঝে রাজউকের ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। এই সবের দায় আমরা নিব না।’

তিনি বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনর সময় রাজউক যখন নারায়ণগঞ্জে জমি বিক্রির জন্য এসেছিল, তখনই আমরা আর্মিকে ভয় না পেয়ে তাদের বিক্রি কার্যক্রম থামিয়ে দিয়েছিলাম। আমি বিষয়টি নিয়ে আর্মি হেড কোয়ার্টারে গিয়ে কথা বলেছিলাম। তাদের কে বিষয়টি বুঝানোর পর জনৈক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমাকে বলেছিলেন, আজকে হয়তো আপনি ওই জমি গুলো উদ্ধারে এতোকিছু করছেন, তবে একদিন আপনাদের দলের জনপ্রতিনিধিরাই ওই জমি বিক্রিতে রাজউককে সহযোগীতা করবে।’

মেয়র বলেন, ‘এখন আমার বলতে দু:খ হয় যে সেদিনের সেই কথাগুলোই আজ সত্যি হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে নারায়ণগঞ্জে যখন গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের মন্ত্রী নারায়ণগঞ্জে আসলেন, তখন আমাদের দলেরই এক জনপ্রতিনিধি তাকে নগরী ঘুরিয়ে রাজউকের প্লট দেখিয়েছিলেন। এমনকি হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এবং রাজউকের নকশায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পেছনের জমিটি গার্ড়ি পার্কিংয়ের জন্য উল্লেখ্য থাকলেও সেই জনপ্রতিনিধি জমিটি বিক্রিতে রাজউককে সহযোগীতা করেছেন। কোন স্বার্থে এসব হচ্ছে তা জানিনা।’


আইভী আরো বলেন, ‘গৃহায়ন মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে কথা হয়েছিলো, তিনি বলেছিলেন যে আমাদের ৫টি মার্কেট আমাদের ফিরিয়ে দিবেন। নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পেছনের (বালুর মাঠ) যে জমিটি, সেটা রাজউকের নকশাতেও কার পার্কিংয়ের উল্লেখ আছে। মন্ত্রী মহোদয় বলেছিলেন ওই জমি কেন বিক্রি করছেন? ওনি (রাজউক চেয়ারম্যান) বলেছিলেন আমরা অন্যত্র জমির ব্যবস্থা করে দিব। আমার বোধগম্য নয় যে ওনারা কোথায় জায়গা দিবেন, সব জায়গাই তো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কারণ গত তেরো বছর ধরে তারা আমাকে জায়গাটি দেয় দেয় করেও দিচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী গত বছর না’গঞ্জে এসে নিজে ফোন করে বলেছেন ৫টি বিল্ডিং ফেরত দেয়া হোক। তৎকালীন না’গঞ্জে ডিসি আনিছুর রহমানকে বলেছিলেন মার্কেট গুলো কেন দেয়া হচ্ছে না। সেগুলো ফেরৎ দেয়া হোক। মন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন আপনি দেখেন ডিসি কী বলে। আমি আমাদের নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলাম ডিসি’র সাথে কথা বলতে। তিনি গিয়ে সেখানে ডিসি সাহেব কে বলেছিলেন কতোদিনের মধ্যে আমাদের মার্কেটগুলো ফেরৎ দেয়া হবে। তিনি (তৎকালীন জেলা প্রশাসক) বলেছিলেন এটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, সময় লাগবে। আমার মনে হয় এটা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলে হবে না।’

আইভী অভিযোগ করেন, ‘নারায়ণগঞ্জে যখন মন্ত্রী আসলো, তখন একজন জনপ্রতিনিধি মন্ত্রী ও ডিসিকে নিয়ে জায়গা গুলো ঘুরিয়ে দেখিছেন। আমার কেন জানি মনে হয় ওই জনপ্রতিনিধি আর ডিসিরা মিলেই ওই জমিগুলো বিক্রি করতে চাচ্ছে। আরো ২০ বছর আগে রেজুলেশন ছিল রাজউক নারায়ণগঞ্জে একটি বড় পার্ক করে দিবে। ২নং রেলগেট থেকে চানমারী পর্যন্ত একটি রাস্তা করে দিবে। এধরণের কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা শুধু বঙ্গবন্ধু সড়ক করেই খালাস নয়। তারা কতো টাকার উন্নয়ণ করেছে তার লিষ্ট আমাদের কাছে আছে। দূর্ভাগ্য আমাদের জনপ্রতিনিধি থাকা সত্বেও তারা সেই জায়গা গুলো নারায়ণগঞ্জের মানুষের সাথে আলোচনা না করেই বিক্রি করে দিচ্ছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাজউক হয়তো বলতে পারে যে আমরা জমিগুলো অধিগ্রহণ করছি, এগুলো আমাদের জায়গা। তাহলে অনেক মালিক রয়েছে যারা তাদের জায়গা গুলো অবমুক্ত করেছিলেন। আমারও একটা মামলা চলমান রয়েছে। আমার ধারণা ছিল যে রাজউক হয়তো কার পার্কিংয়ের জায়গাটি বিক্রি করবে না। কারণ তারা যে জায়গা বিক্রি করছে সেখানে প্লট হলেও তাদের গাড়ি রাখার জন্য একটি জায়গার প্রয়োজন। কিন্তু সেই জায়গাটিও বিক্রি হয়ে গেছে। মন্ত্রী বলেছিলেন যে ৫টি মার্কেট আমাদের দিবেন এর পরেও জায়গা গুলো বিক্রি করা হচ্ছে। এখন আমাদের রয়েছে আর মাত্র ২/৩টি প্লট, সেগুলোও নেয়ার পাঁয়তারা চলছে।’

আইভী বলেন, ‘আপনারা অনেকেই জানেন যে বিনোদন সুপার মার্কেট নিয়ে একটি মামলা চলমান রয়েছে। এই জায়গাটি আমাদের নিজেদের জায়গা। এখানে একটি পার্ক হওয়ার কথা ছিল। আমরা লাইসেন্স নিয়েছিলাম মানুষের সেবা করবো বলে। কিন্তু পরবর্তীতে পৌর চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকা ও নাজিম উদ্দিন মাহমুদ মারা যাওয়ার পর এখানে যারা ছিলেন, রাতারাতি বিল্ডিং করে তারা একটি করে দোকান নিয়ে নিলেন। পরে আমি ২০০৩ সালে দায়িত্ব নিয়ে আমি আমার জায়গা ফেরত চাইলাম। রাজউকও বিনোদন কে একটা চিঠি দিয়েছিল নকশা বহির্ভূত হওয়ায় সেটা ভাঙার জন্য। আমরা মামলাও করেছিলাম। আমরা মামলা জিতে গেলেও গত তিন বছর যাবত রাজউক মামলা লড়ে যাচ্ছেন। আমরা যতোবারই আইনী কাগজপত্র মন্ত্রনালয়ে দিয়ে আসি ততোবারই সেগুলো গায়েব হয়ে যায়। বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান অনেক ভালো মানুষ শুনেছি। সুতরাং আমরা আশা করবো তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।’

সভার শুরুতে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো: সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে নগর ভবনে চেয়ারম্যান মহোদয়ের আসার কথা ছিল। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার কারনে তিনি নারায়ণগঞ্জে আসতে পারেন নি। তাই আমাদের পাঠিয়েছেন, আমরা আপনাদের সমস্যাগুলো নোট করে নিয়ে চেয়ারম্যান মহোদয়কে জানাবো। তিনি পরবর্তীতে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিবেন।’

তার সাথে প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ছিলেন, রাজউকের ড্যাপ প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সহ পরিচালক মাহফুজা আক্তার, ভূমি ব্যবস্থাপক রেদোয়ান সাঈদসহ ড্যাপ’র অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নগর পরিকল্পনাবিদ মো: মঈনুল হকের সঞ্চালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএফএম এহতেশামুল হক, নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আজগর, নাসিক ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরন বিশ^াস, নাসিক ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসাইন, নারী কাউন্সিলর বিভা হাসান, মিনোয়ারা বেগম প্রমুখ।

কিন্তু সভায় রাজউক চেয়ারম্যান উপস্থিত না থাকায় নাগরিক সমাজ ও কাউন্সিলরবৃন্দের দাবীর প্রেক্ষিতে মেয়র আইভী সর্বসম্মতিক্রমে সভাটি স্থগিত করতে বাধ্য হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here