নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠা কালীন সদস্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও মেহনতি গরীবের বন্ধু হিসেবে পরিচিত সর্বজন শ্রদ্ধেয় নারায়ণগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী দু’টি আলোচিত পরিবারের কর্ণধার হচ্ছেন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত মরহুম ভাষা সৈনিক এ কে এম শামসুজ্জোহা এবং ধর্মভীরু মরহুম আলী আহাম্মদ চুনকা (র:)।
প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে যাদের নাম রয়েছে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। যারা দেশ ও মানুষের স্বার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সকল আন্দোলনে, বিলিয়ে দিয়েছিলেন নিজেদের সর্বস্ব, অর্জন করেছেন আমজনতার সম্মান ভালবাসা। আর উভয়েই জন্ম দিয়েছেন এমন সন্তানদের, যারা নিজেরাও পিতার মতই জনপ্রতিনিধি হয়ে করে যাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জবাসীর উন্নয়ণে সেবা।

তাই তো মৃত্যুর পরেও বর্ষীয়াণ এই দুই রাজনীতিবিদকে আদৌ স্মরণ করে আসছে সাধারন জনগণসহ নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিবিদরা।

যার প্রেক্ষিতে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারী ভাষা সৈনিক এ কে এম শামসুজ্জোহা এবং ২৫ ফেব্রুয়ারী আলী আহাম্মদ চুনকার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ আয়োজন করেছে স্মরণ সভা ও দোয়া।

আগামী মঙ্গলবার ২০শে ফেব্রুয়ারী, প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষা সৈনিক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মরনোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত এ কে এম শামসুজ্জোহার মৃত্যুবার্ষিকী।

কে এই শামসুজ্জোহা:

অবিভক্ত বাংলার নির্বাচিত এমএলএ খাঁন সাহেব ওসমান আলীর পুত্র ছিলেন এ কে এম শামসুজ্জোহা। যিনি ১৯৪২ সালে নারায়ণগঞ্জ স্টুডেন্ট মুসলিম লীগ এর সেক্রেটারী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আসেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হলে বাবা খান সাহেব ওসমান আলীর সাথে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও শহর শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন শামসুজ্জোহা। পৈত্রিক বাড়ী বায়তুল আমানে বসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরকে নিয়ে করেছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠা।

এরপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ‘ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ’ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ, মুজিব নগর সরকারের গণ-পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য পদে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তারপর ১৯৮৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে লাখো জনতাকে কাঁদিয়ে পরপারে পারি জমান ভাষা সৈনিক এ কে এম শামসুজ্জোহা। যিনি পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১১ লাভ করেন।

শামুসজ্জোহার তিন পুত্রের মধ্যে বড়জন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ এ কে এম নাসিম ওসমান জীবদ্দশায় নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের জাতীয় পার্টির এমপি হিসেবে একাধিকবার নির্বাচিত হয়ে জনগণের উন্নয়ণে কাজ করে গেছেন।

২০১৪ সালের ৩০ জুন নাসিম ওসমান মারা গেলে তার শূণ্য আসনে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন শামসুজ্জোহার মেঝ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম ওসমান।

আর নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য হিসেবে এখন বিশ^ব্যাপী আলোচিত শামসুজ্জোহার কনিষ্ঠ পুত্র আলহাজ¦ এ কে এম শামীম ওসমান।

কে এই চুনকা:

বিশিষ্ট কৃষক মুহাম্মদ ওয়াহেদ আলীর পুত্র ছিলেন নারায়ণগঞ্জের মুকুটহীন স¤্রাট, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকা।

১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশ এলাকায় প্রচন্ড মহামারী দেখা দেয়। বসন্ত রোগ জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তখন নিজ হাতে রোগীদের সেবা শুশ্রুষা করার পাশাপাশি সহকর্মীদের সাথে নিয়ে মৃতদের দাফন-কাফন করার মাধ্যমে সাধারন মানুষের নয়নের মনি হয়ে উঠেন চুনকা।

১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে। সে সময়ে তিনি অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। নিজের জীবন বিপন্ন করে বিবাদমান পক্ষগুলোকে হানাহানি, রক্তপাত ও জীবন হননের পাশবিক উল্লাস থেকে বিরত রাখতে দু:সাহসিক ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৬৯-এ ডেমরার টর্নেডো, ৭০-এ হাতিয়া সন্ধীপের জলচ্ছাস, ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ সর্বপরি চুনকার অবদান সারা নারায়ণগঞ্জবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না।

১৯৭২ সালে আলী আহাম্মদ চুনকাকে সকল মুরীদদের উপস্থিতিতে ঢাকার নবাব বাড়ীর পীরে কামেল হযরত শাহ সৈয়দ খাজা নাজমুল হাসান নকশেবন্দ আবুল উলা (র:) ত্বরিকতের খেলাফত প্রদান করেন। যা তার জীবনে এক বিরাট সাফল্যের স্বর্ণদুয়ার খুলে দেয়।

রাজনীতির পাশাপাশি কাবাডিতে বহুবার জীবনে স্মরণীয় পুরস্কারও পেয়েছেন চুনকা। তার কৃতিত্ব খেলার মাঠ থেকে পৌরসভার চেয়ারম্যানের কার্যালয় পেরিয়ে রাজনৈতিক গগণে বঙ্গবন্ধুর মনের গভীরে অবস্থান নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেই ছায়া থেকে মানুষের জন্য কাজ করাই ছিল চুনকার স্বপ্ন সাধনা। এরপর দলীয় বিরোধীতা স্বত্ত্বেও বিপুল ভোটে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আলী আহাম্মদ চুনকা।

পরবর্তীতে গণমানুষের নেতা, ধর্মভীরু আলী আহাম্মদ চুনকা অনেক কিছু করতে না পারার বেদনা বুকে চাপা নিয়েই ১৯৮৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জবাসীকে অশ্রুজলে ভাসিয়ে পরপারে চলে যান।

বর্তমানে মরহুম চুনকার বড় মেয়ে ডা: সেলিনা হায়াত আইভী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ণ করে বিশ^ব্যাপী আলোচিত হয়ে গেছেন।

চুনকার মেঝ পুত্র আলী আহাম্মদ রেজা উজ্জল শহর যুবলীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে জনগণের সেবা করছেন এবং ছোট পুত্র আলী আহাম্মদ রেজা রিপন ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

এদিকে, মরহুম শামসুজ্জোহা ও মরহুম চুনকার মুত্যবার্ষিকীর আয়োজন সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডিকে জানান, ‘মরহুম ভাষা সৈনিক এ কে এম শামসুজ্জোহার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০ ফেব্রুয়ারী এবং মরহুম আলী আহাম্মদ চুনকার মতৃ্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারী সকালে নগরীর দলীয় কার্যালয়ে জেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে স্মরণ সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here