নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামীলীগের কার্যকরী সদস্য আলহাজ¦ এ কে এম শামীম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী দুই জনপ্রতিনিধি তথা নেতাদ্বয়ের কারনেই দীর্ঘবছর যাবত নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে বিভক্ত থাকলেও তা যেন মানতে নারাজ উভয়ই।

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বিগত ২০১৬ সালে খোদ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা যেখানে ভাই-বোন সম্পর্কিত এই দুই নেতাকে গণভবনে একত্রিত করে দিয়েও ঐক্য গড়াতে পারেননি, সেখানে এখন শামীম ওসমান ও আইভী একই দাবী করছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে নাকি কোন দ্বন্দ নেই, আছে শুধু নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, তবে নেতাকর্মীরা আছেন ঐক্যবদ্ধ।’

সাংসদ শামীম ওসমানও প্রায়ই দলীয় অনুষ্ঠানে দাবী করছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা থাকলেও কোন দ্বন্দ নেই। এখানে সবাই ঐক্যবদ্ধ আছে। তবে এই ঐক্য বিনষ্টে নানা ষড়যন্ত্র চলছে, এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

ঠিক একই দাবী করেছেন সিটি মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীও। গত ৩ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে জেলা আওয়ামীলীগের পক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে কোনো বিভক্তি নেই। এখানে নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, তবে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে তৃণমূল নেতাকর্মী তথা দল আরও বেশী ঐক্যবদ্ধ।’

যেমনটি দেখাগেছে, গত বছরের শেষ নাগাদ নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ঐতিহ্যবাহী এলিট শ্রেণীর ক্লাব হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডের নির্বাচনে।

উভয়ক্ষেত্রেই দেখাগেছে, শামীম ওসমান ও আইভীর নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রতিযোগিতা।

গত বছরের ২৫ নভেম্বর ঘোষিত জেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে দেখাগেছে, ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরও বেশী নিজ বলয়ের নেতাদের অধিষ্ঠিত করে নিজের নেতৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন আইভী।

কিন্তু বিপরীতে প্রভাবশালী হওয়া সত্বেও জেলা কমিটিতে নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য শামীম ওসমান নিজ বলয়ের নেতাদের তেমন পদায়ন করতে পারেননি। ফলে জেলা কমিটির নেতৃত্ব শেষতক আইভীর কব্জায়ই চলে যায় বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অপরদিকে, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবটি এলিট শ্রেণীর ক্লাব হিসেবে পরিচিত হলেও এবারের নির্বাচনে সভাপতি পদ প্রার্থী দুইজনের মধ্যে একজন শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহম্মেদ টিটু এবং অপরজন এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম আইভীর সমর্থিত প্রার্থী হওয়ায়, এই নির্বাচনকে ঘিরে নেতৃত্ব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়ে গিয়েছিলেন আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এই দুই নেতা।

তবে শেষতক নারায়ণগঞ্জ ক্লাব নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী এড. মাহবুবুর রহমান মাসুমকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে তানভীর আহম্মেদ টিটু সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে জয়ী হন শামীম ওসমান।

এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের সুপারিশে গত বছরের মে মাসে জেলা ও মহানগর যুব মহিলালীগের কমিটি গঠন হলেও নিজ নেতৃত্ব ধরে রাখতে শামীম ওসমান পাল্টা কমিটির অনুমোদন করান।

শুধু তাই নয়, নিজ বলয়ের নেতাদের নিয়ে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষকলীগ জেলা ও মহানগর কমিটিও অনুমোদন করান শামীম ওসমান।

কিন্তু নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে কোন দ্বন্দ নেই, শামীম ওসমান ও আইভীর এমন দাবী কোনক্রমেই মানতে নারাজ শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

কারন হিসেবে তারা বলেন, শামীম ওসমান এবং আইভীর মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দের কারনেই দীর্ঘবছর যাবত নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উত্তর-দক্ষিণ মেরুতে বিভক্ত হয়ে আছে।

যার ফলে দলীয় কোন কর্মসূচীতেই অদ্যবধি শামীম ওসমান ও আইভী একত্রিত হতে পারেননি। যেমনটি পরিলক্ষিত হয়েছিল গত বছর।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গত বছরের ১২ আগষ্ট নগরীতে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের সর্ববৃহৎ র‌্যালীতে আইভীর উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শামীম ওসমান দাবী করেছিলেন, ‘শোক র‌্যালীতে আইভীর উপস্থিতিতেই প্রমাণ হবে, যে আইভীর সাথে তার কোন দ্বন্দ নাই।’

কিন্তু সেদিন বৃষ্টি উপেক্ষা করেই নগরীতে শামীম ওসমান স্মরণকালের সর্ববৃহৎ শোক র‌্যালী বের করলেও তাতে ছোট বোন মেয়র আইভী ছিলেন অনুপস্থিত।

পরে শোক র‌্যালী পূর্বক সমাবেশে আইভীর অনুপস্থিতির কারনে শামীম ওসমান ভারাক্রান্ত মনে বলেন, ‘আমি প্রত্যাশা করেছিলাম শোক র‌্যালীতে আইভীসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু তারা হয়তো কোন কারনে এখানে উপস্থিত হতে পারেন নাই। তবে আমি প্রত্যাশা করবো আগামীতে দলীয় যেকোন কর্মসূচী সবাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে পালন করবেন।’

পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের একাধিক কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হলেও শামীম ওসমান এবং আইভী অনুসারীদের একত্রে কোন কর্মসূচীতেই দেখা যায়নি।

তবে তৃণমূলের মতে, সকল অভিমান ভুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শামীম ওসমান আইভীকে বহুবার ছোট বোন হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঐক্য গড়ার চেষ্টা করলেও আইভী তাতে সাড়া দেননি। উপরন্তু সম্প্রতি একমাত্র পুত্রের বিয়েতে ২৫ কোটি টাকা খরচের মন্তব্য করে আইভী শামীম ওসমানকে উল্টো ক্ষেপিয়ে তুলেন।

তাই, শামীম ওসমান আর আইভী যেদিন সত্যিকার অর্থেই সকল অভিমান ভুলে দলের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রমাণ দেখাতে সক্ষম হবেন, কেবল সেদিনই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের প্রকৃত ঐক্য গড়ে উঠবে, তারপূর্বে ঐক্য শুধুই মুখে হবে, বাস্তবে নয় বলে দাবী করেন দলটির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here