নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: স্থানীয় নেতাদের সাথে নিজেদের মধ্যে চলমান কোন্দল আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থামানোর নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি মনোনয়ন ইস্যুতে নারায়ণগঞ্জ জেলার ক্ষমতাসীন দলের ৩ সাংসদ কে সতর্কও করে দিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানাগেছে, বিভিন্ন জেলার ন্যায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ক্ষমতাসীন দলের সাংসদদের সাথেও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের দ্বন্দ রয়েছে।

যার মধ্যে সবচেয়ে বেশী আলোচিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) সাংসদ আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমানের সাথে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর মধ্যকার দীর্ঘ বছরের কোন্দল। যেই কোন্দল মিটানোর জন্য গত বছর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পূর্বে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শামীম ওসমান ও আইভীকে গণভবনে তলব করে মিলিয়ে দেয়ার পরেও অদ্যবধি নিরসন হয়নি।

তন্মধ্যে সম্প্রতি যুব মহিলা লীগের একটি গঠন ইস্যুতে শামীম ওসমানের সাথে নতুন করে দ্বন্দে জড়ায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন, সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা ও সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা।

তবে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের সাথে নিজেদের মধ্যকার সৃষ্ট কোন্দল নিরসন করতে ইতিমধ্যে সক্ষম হলেও ছোট বোন আইভীকে কোন ক্রমেই বাগে আনতে পারছেন না শামীম ওসমান। আর এরজন্য আইভীই দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দ।

অপরদিকে, স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতিক এবং নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সাংসদ আলহাজ¦ নজরুল ইসলাম বাবুর মধ্যকার কোন্দলও চলছে বছরের পর বছর যাবত। আর এই দলীয় কোন্দলের কারনে প্রতিনিয়তই এই দু’টি আসনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ঘটছে সহিংসতার মত ঘটনা। যেই সহিংসতায় ইতিমধ্যে প্রাণও দিতে হয়েছে বেশ কয়েকজনকে।

স্থানীয় সূত্রে জানাযায়, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামীলীগে কোন্দল সৃষ্টির কারিগরই হচ্ছেন সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী। যিনি সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় আওয়ামীলীগের একক নিয়ন্ত্রণ ভার নিতে চাওয়ায় তার সাথে দীর্ঘ বছর যাবত কোন্দল চলছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও থানা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক শাহজাহান ভূইয়া ও কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ¦ রফিকুল ইসলাম ওরফে আন্ডা রফিকের।

তন্মধ্যে গাজী কয়েক মাস পূর্বে শাহজাহান ভূইয়ার সাথে নিজেদের মধ্যকার কোন্দল কিছুটা নিরসন করতে সক্ষম হলেও প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা আন্ডা রফিকের সাথে চলমান কোন্দল জিইয়ে রাখায় তা প্রতিনিয়ত চরম আকার ধারন করছে।

শুধু তাই নয়, গাজী স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে নিজের কর্মচারীর মত ব্যবহার করায় রূপগঞ্জে আওয়ামীলীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যকার কোন্দলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে জানান, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক শীর্ষ নেতা।

তবে কম যান না নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ নজরুল ইসলামও। স্থানীয় আওয়ামীলীগের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কোন্দল সৃষ্টি করেছেন এই এমপি বলে অভিযোগ করেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দরা।

স্থানীয়দের মতে, উক্ত আসনে ভোটের রাজনীতিতে খাগাকান্দা, কালাপাহাড়িয়া, উচিৎপুরা ও বিশ^নন্দী ইউনিয়ন যেকোনো নির্বাচনেই জয়-পরাজয়ের নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। আর আড়াইহাজার উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় ভোট ব্যাংক এই ইউনিয়ন ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী কোন্দল সৃষ্টি করেছেন এমপি বাবু পশ্চিমাঞ্চলে বসে।

স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দরা জানান, সর্বশেষ ইউপি নির্বাচন ও পৌরসভা নির্বাচনের পর থেকে এসব এলাকার ভোটার ও নেতাকর্মীদের মধ্যে এমপি বাবুর প্রতি বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

খাগকান্দা ইউনিয়নের এক আওয়ামী লীগের নেতা বলেন, বিগত ইউপি নির্বাচনে এমপি বাবু অনেকটা একগুয়ামী করে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের নানা কৌশলে বিজয়ী করেছেন। এতে অনেক আওয়ামী লীগের নেতাই নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অনেক জনপ্রিয় নেতা নির্বাচন করতে পারেনি। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন চেয়ারম্যান প্রার্থী। বিভিন্ন ইউনিয়নের অনেক জনপ্রিয় মেম্বার প্রার্থীকেও এমপি বাবু জোর করে নির্বাচন থেকে দূরে রেখেছেন। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়নেই এমন ঘটনা হয়েছে।

খোদ দুপ্তারা ইউনিয়নও এই প্রভাবের বাইরে ছিল না। এখানেও সুজন নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও চেয়ারম্যান প্রার্থীকে পরাজিত করে, নানা কৌশলে বিজয়ী করা হয়েছিল জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা শাহীদা মোশারফকে।

এছাড়াও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনোদিন বিরোধ ছিল না। কিন্তুবাবু এমপি হওয়ার পরই এখানে কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় হয়েছেন। এতে বালু মহল নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। শান্তিপ্রিয় এই জনপদে এখন খুনের মতো ভয়ানক ঘটনাও ঘটেছে। শতশত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা হয়েছে। অনেকেই গ্রেফতারের ভয়ে এখনো এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

আর এসব ঘটনার পর থেকে উপজেলার দক্ষিন-পূর্বাঞ্চলের ভোটার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে বাবু অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। যার প্রভাব আগামী সংসদ নির্বাচনে ব্যাপাকভাব পড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের একাধিক শীর্ষনেতা।

তাই গত ২২ নভেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্যদের সাথে বৈঠক কালে দলীয় সকল সংসদ সদস্যকে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় নেতাদের নিজেদের মধ্যে কোন্দল থামানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের এই সভায় অন্যান্য জেলার সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলার ক্ষমতাসীন দলের সাংসদবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।

ভোটের এক বছর আগে ক্ষমতাসীন দলটির স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে নানা কোন্দলের খবর গণমাধ্যমে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে দলের সংসদ সদস্যদের সতর্কও করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সভায় উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক নারী সংসদ সদস্য জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজ নিজ এলাকায় এমপিদের কাঁদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতে বলেছেন। কোন্দল সৃষ্টিকারীদের হুঁশিয়ার করে তিনি বলেছেন, একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনের নেতিবাচক আচরণ শুনতে চাই না।’

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন করে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এলাকায় গিয়ে বর্তমান সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কথা বলছেন বলে বৈঠকে আলোচনা ওঠার পর শেখ হাসিনার এই হুঁশিয়ারী দেন।

ওই নারী সংসদ সদস্য আরো জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এলাকায় গিয়ে কাজ করা তো ভালো কথা। যে কাজ করতে চায়, করবে। এখন যারা এমপি আছেন, পরের বার যে তাকেই নমিনেশন দেয়া হবে, এমনটি নয়। জরিপের ভিত্তিতে জনপ্রিয় ব্যাক্তিকে নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হবে। ছয় মাস পর পর জরিপ হচ্ছে। কেবল স্বচ্ছ ও জনপ্রিয় ব্যাক্তিদেরই আগামীতে মনোনয়ন দেয়া হবে।’

দলীয় সংসদ সদস্যদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তার জন্য সবাইকে কাজ করতে বলেছেন শেখ হাসিনা বলে জানান, আরেকজন সংসদ সদস্য।

ফলে নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্ষমতাসীন দলের তিন সাংসদের জন্য এটি শেখ হাসিনার ‘সতর্কবার্তা’ বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here