শিবির ও জঙ্গিবাদমুক্ত ক্যাম্পাস গড়তে ছাত্রলীগ কাজ করবে

0
745

বলা হয়ে থাকে গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও সাফল্যের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতেই গড়া এ ছাত্র সংগঠনটি ৬৮ বছরে পা রাখছে ৪ জানুয়ারি। প্রতিষ্ঠার পর নেতৃত্বের পালাবদলে এখন সংগঠনটির চালকের আসনে আছেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. সাইফুর রহমান সোহাগ। গত জুলাইয়ে সারা বাংলাদেশের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। শনিবার সংগঠনটির অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভোরের কাগজের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন ছাত্রলীগের এই সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে তার সঙ্গে কথা বলেন ভোরের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার মুহাম্মদ রুহুল আমিন। তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো-
ছাত্রলীগের ৬৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, বিদ্যার সাথে বিনয়, শিক্ষার সাথে দীক্ষা, কর্মের সাথে নিষ্ঠা, জীবনের সাথে দেশপ্রেম এবং মানবীয় গুণাবলীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অতিক্রম করেছে গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও সাফল্যের ৬৮ বছর। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতেই ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা তার আদর্শের লড়াকু সৈনিক। প্রতিষ্ঠার পর হাটি-হাটি, পা-পা করে বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মেধাবীদের স্থান দেয়া হয়েছে সংগঠনে।
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাত্রলীগ করতে হলে শুধু ভালো কর্মী হলেই চলবে না ভালো ছাত্রও হতে হবে। মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতেও এগিয়ে থাকতে হবে। আমরা সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলছি-তাকে ছাত্রতো হতেই হবে। শুধু ভালো ছাত্র হলেই চলবে না, ভালো খেলোয়ারও হতে হবে। সব দিকেই আমাদের যোগ্যতা থাকতে হবে। আমরা শুধু যোগ্যদের নিইনা যোগ্যতাও অর্জন করতে সহযোগিতা করি। ছাত্রলীগ যোগ্যতা তৈরির কারখানা।
ছাত্রলীগের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহাগ বলেন, ছাত্রলীগ অনেক সুসংগঠিত সংগঠন। বর্তমানে এ সংগঠনের নেতা ও কর্মীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের কারণেই বিগত সময়ে ছাত্রলীগে বিশৃঙ্খলা হয়েছে। সামনে কোনো অনুপ্রবেশকারী ছাত্রলীগে প্রবেশ করতে পারবে না। প্রাণের এই সংগঠনে যাতে একজন অনুপ্রবেশকারীও ঢুকতে না পারে সে দিকে কড়া নজর রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীদের কারণে আমাদের অনেক দুর্নাম হয়েছে। বিশৃঙ্খলা ঘটেছে। ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পারে না। এখানে জাতির পিতার আদর্শ রয়েছে। এ বছর প্রত্যেক নেতা-কর্মীর ব্যাকগ্রাউন্ড দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেই প্রাথমিক সদস্য পদ দেয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমরা মেধাবীতের আরো বেশি প্রধান্য দেয়ার পাশাপাশি মেধা তৈরিতে কাজ করবো। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরাই ছাত্রলীগ করবে। ফলে ভবিষ্যতে ছাত্রলীগের এই দুর্নাম থাকবে না।
১ জানুয়ারি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ছাত্রলীগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ছাত্র দলকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ছাত্রদল এ ধারাটি শুরু করেছে এ বছর থেকেই। আমরা সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই এ ধারা অব্যাহত রেখেছি। আমি নিজেই পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক থাকাকালে এ কাজটি করেছি। আমরা সবাইকে দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। কারণ আপনারা জানেন এবারে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে প্রধান অতিথি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি এখন শুধু বিএনপি নেত্রী নন, জঙ্গী মাতা হিসেবে পরিচয় রয়েছে। তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হন কি করে? ছাত্রদল নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। শুধু বলবো- ১ জানুয়ারি এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী হয়েছে। আসলে তাদের কি নিয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী? এই সংগঠনটির জন্ম কিসের মাধ্যমে?
এ সময় তিনি ছাত্রলীগের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধের গণঅভ্যূত্থান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ছয় দশকের সবচেয়ে সফল সাহসী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এটা কারো কাছে গোপন কিছু নয়। আর ছাত্র দলের ইতিহাস খুঁঁজেন তাদের জন্ম হয়েছে কোথা থেকে?
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদদের নিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্র্সন ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে ছাত্রলীগের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ২১ ডিসেম্বর আমাদের শহীদদের নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক ও মুক্তিযোদ্ধার জন্য এ থেকে বড় লজ্জা আর কিছুই হতে পারে না। এরপর স্পষ্ট হয়েছে আসলে বাংলাদেশে খালেদা জিয়া কি চায়। এ বছর পৌর নির্বাচনে বিজয় লাভ করার পর মানুষ বলেছে- বাংলাদেশ (আওয়ামী লীগ) পেয়েছেন ১৮০ আর পাকিস্তান (বিএনপি) ২৩। আমি এই মুহূর্তে প্রতিবাদের ভাষায় বলতে চাই খালেদা জিয়ার এ থেকে লজ্জার আর কিছুই হতে পারে না।
ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুর্নাঙ্গ কমিটি দেয়া হবে। আমরা এজন্য কাজ করছি। তবে এবার কোনো অনুপ্রবেশকারী ঢুকতে পারবেনা। সব নেতাকর্মীর ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেই কমিটিতে জায়গা দেয়া হবে।
প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর কর্মসূচি বিষয়ে সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ৪ জানুয়ারি সকাল থেকে অনুষ্ঠান শুরু হবে। সকাল ৬ টায় ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল, ৮ টা ১ মিনিটে কার্জন হলে কেক কাটা, ১০টায় র‌্যালি, পরদিন ৫ জানুয়ারি রক্তদান কর্মসূচি, ৬ জানুয়ারি শীতবস্ত্র বিতরণ, ৭ তারিখ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ওপর পাঠ চক্র উদ্বোধন ও বিতরণ ও ৮ তারিখ আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
তবে আমরা এবার একটু ভিন্ন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করেবো। প্রতিবছর রাত ১২টায় কেক কাটার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হতো। তখন আমাদের বোনেরা উপস্থিত থাকতে পারতো না। এবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই অনুষ্ঠান সকালে করা হচ্ছে। সবাই উপস্থিত থাকতে পারবে। ব্যানার ফেস্টুন ছাড়াই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী হচ্ছে। পোস্টার-ফেস্টুনে ছাত্রলীগের কারো কোনো ছবি থাকবে না। কোথাও এ ধরণের ব্যানার ফেস্টুন থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই অপসারণ ও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা ও উপস্থিতি বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে সব ছাত্র সংঘটন আছে। সবাই তাদের কর্মসূচি পালন করেন। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো দিকে লক্ষ করুন তাদেরকে কেউ বাধা দিচ্ছে না। কিন্তু ছাত্রদল তো ক্যাম্পাসে আসেন না। তাদেরকে মধুর ক্যান্টিনে ডাকলেও আসেন না। তারা যদি ক্যাম্পাসে আসে নো প্রবলেম। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দাওয়াতের কার্ড দিতে আসছে। কেউ কি তাদেরকে কিছু বলেছে? আসলে তারা তো কেউ ছাত্র না। তাদের বয়স অনেক বেশি। লজ্জায় তারা মধুতে আসতে চায় না।
অসাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি মুক্ত দেশ গড়তে ছাত্র লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি বিষয়ে জানতে চাইলে সোহাগ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি ক্যাম্পাস শিবির তথা সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সব সময় সোচ্চার ছিলো। আমরা ৪ জানুয়ারির পর শিবির- যুদ্ধাপরাধী মুক্ত বাংলাদেশ গড়ব। যারা আছে তাদেরকে বাংলাদেশ ছাড়তে অনুরোধ করছি।
শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে ছাত্রলীগের পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের শুরু থেকেই নিয়মিত পাঠ চক্র, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, পূর্ণমিলনী, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা, বৃক্ষরোপন অভিযান, শীতবস্ত্র বিতরণ, শিক্ষা উপকরণ বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আমরাও তা করে যাচ্ছি।
ছাত্রলীগের বর্তমান সংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ছাত্রলীগ অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় সাংগঠনিকভাবে সুশৃঙ্খল। ছাত্রলীগের এই ঐক্যকে ধারণ করেই আমরা আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সব ছাত্রসমাজ, শিক্ষা ও প্রশাসনে যারা আছেন তাদেরও সহযোগিতা চাই। অপরাপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সংগঠনগুলোকে নিয়ে ছাত্রলীগ এগিয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here