নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘যতটা গর্জে ততটা বর্ষে না’। ঠিক যেন তেমনটাই হয়েছে এখন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের তুখোড় সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ক্ষেত্রে। যিনি প্রথমবারের মত নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পাড়ের পূণ্যভূমিতে এসে নিজেকে ধন্য মনে করলেও প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেরী সার্ভিস চালু করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবী করেছেন নারায়ণগঞ্জের সদর-বন্দরবাসী।
কারন হিসেবে বিশিষ্টজনেরা বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি সেতুর স্বপ্ন প্রায় ৪৬ বছর যাবত দেখে আসছে সদর-বন্দরবাসী। যার ফলশ্রুতিতে গত ২৩ নভেম্বর যখন বন্দর উপজেলায় নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের জাতীয় পার্টির সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম সেলিম ওসমানের অর্থায়নে নির্মিত তিনটি স্কুল উদ্বোধনে প্রথমাবারের মত নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পাড়ে সেতুমন্ত্রী এসেছিলেন, তখন শীতলক্ষ্যা নদীর নবীগঞ্জ-হাজীগঞ্জ ঘাট দিয়ে একটি ব্রীজ নির্মানের জোরালো দাবী জানিয়েছিলেন স্থানীয় হাজার হাজার জনতা।’

‘এরপর বন্দরের ত্রিবোনী মিনারবাড়ি এলাকায় শামসুজ্জোহা মুছাপুর বন্দর (এম.বি) ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্বোধনের পর এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে সাংসদ সেলিম ওসমানের প্রশংসা করাসহ স্থানীয়দের অভ্যর্থণায় মুগ্ধ হয়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পক্ষকালের মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেরী সার্ভিস চালুর ঘোষণা দেন।’

বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সেদিন বলেছিলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামের সূঁতিকাগার এই নারায়ণগঞ্জ। আমাদের সকল সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জ থেকে গড়ে উঠেছিল দূর্বার আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন, সংগ্রামে সাথে সাথী ছিল এই নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষ্যা পাড়ে এই পূণ্যভূমিতে এসে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে এই নারায়ণগঞ্জে কোন সমাবেশে আমার প্রথম আগমন।’

স্থানীয়দের দাবীর প্রেক্ষিতে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘দেখুন একটি সেতু করতে অনেক সময় লাগে। শীতলক্ষ্যা সেতু আমরা অনেক আগেই করতে পারতাম। এটি বিদেশি প্রজেক্ট। ধাপে ধাপে সবকিছু করতে হয়। একটি ব্রীজ করতে হলে কতগুলো প্রসেস লাগে, যেগুলো আমাদের ফলো করতে হয়। প্রথমত সার্ভে লাগে, তারপর আসবে নির্মান প্রক্রিয়া। সেখানে বিদেশী সহযোগিতা লাগে। যদি তা নাও পাই তাহলেও আমরা ব্রীজ করবো। কারন সেলিস ওসমানের মত বড় মনের ব্যবসায়ীরা থাকাতে আমরা সাহস পাই। যদি পদ্মা সেতুর মত কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট আমরা নিজেরা করতে পারি তবে শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি ব্রীজও আমরা নিজেদের অর্থায়নে করতে পারবো। বিদেশী সহায়তা না পেলেও আমরা চেষ্টা করবো।’

তারপর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক পক্ষকালের মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেরী সার্ভিস চালুর ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘প্রথমত আমি খেয়াঘাটের স্থানে ফেরী চালু করে দিচ্ছি। আমি মন্ত্রী হিসেবে বলে দিলাম আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ফেরি চালু হবে। কারন আমি সেই কথা বলবো না, সেই ওয়াদা দেবনা যেটা রাখতে পারবো না। কারন এটাই শেখ হাসিনার অঙ্গীকার। জনগনকে ধোকা দিয়ে বোকা বানানোর কাজ আমরা করিনা। তবে সেতুর নির্মান কাজ শুরু হবে। নিয়ম অনুযায়ী যা করার আমরা করছি। যতটুকু বলা আছে তা হবে, আর যা কথা দিয়েছি তা রাখবো।’

কিন্তু গত ৮ ডিসেম্বর সেতুমন্ত্রীর ঘোষিত পক্ষকাল অর্থাৎ ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও শীতলক্ষ্যা নদীতে এখনো দেখা দিলেনি ফেরী সার্ভিসের। অথচ, মন্ত্রী সেদিন জোর গলায় ঘোষণা দিয়ে গেলেও সময়মত ফেরী সার্ভিস চালু করতে না পারায় তিনি জনগনকে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ধোকা দিয়ে সদর-বন্দরবাসীকে বোকাই বানিয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করছেন সাধারন জনতা।

বন্দরবাসীর আক্ষেপ, ‘সেলিম ওসমান একজন এমপি হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় জনগণের স্বার্থে বন্দর সেন্ট্রাল খেয়াঘাটের টোল ফ্রি’র পাশাপাশি নিজ অর্থায়নে ফ্রি ট্রলার সার্ভিসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অথচ, একজন মন্ত্রী হয়েও ওবায়দুল কাদের তার দেয়া সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি সেদিন যতটা গর্জে উঠে পক্ষকালের মধ্যে শীতলক্ষ্যায় ফেরী সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তবে তা আর দেখাতে পারেন নি।’

আবার অনেকে টিপ্পনী কেটে মন্তব্য করেন, ‘মন্ত্রীরা সাধারন জনগণের মাঝে আসলে আবেগঘন হয়ে অনেক সময় মানুষের মন রক্ষার্থে অনেক প্রতিশ্রুতিই দিয়ে থাকেন। কিন্তু নানান কাজের চাপে পরবর্তীতে তা ভুলেও যান। ঠিক যেমনটা হয়েছে, আমাদের বন্দরবাসীর ক্ষেত্রেও। তাই তো মন্ত্রী বলেছিলেন ঠিকই, যে তিনি যা কথা দিয়েছেন তা রাখবেন। হয়তো বা কোন কারন বশ:ত তিনি শীতলক্ষ্যায় ফেরী সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতির বিষয়টি ভুলেই গেছেন!

তাহলে কি আসলেই মন্ত্রী ঘোষণা অনুযায়ী পক্ষকালের মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেরী সার্ভিস চালুর বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন, নাকি প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন- এই সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে যোগাযোগের জন্য তার পিএস নাছের এর মুুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডিকে জানান, ‘সেতুমন্ত্রী ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে ব্যস্ত আছেন।’

আর মন্ত্রীর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী যথাসময়ে ফেরী সার্ভিস চালু না হওয়ায় কোন টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছে কিনা তা জানতে স্থানীয় এমপি অথবা সওজ এর নির্বাহী প্রকোশলীর সাথে এই প্রতিবেদককে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
কিন্তু এই ব্যাপারে স্থানীয় নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম সেলিম ওসমানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব না হলেও বিশ^স্ত সূত্রে জানাগেছে, ফেরী সার্ভিস চালুর জন্য সেলিম ওসমানের পক্ষ থেকে যা যা করনীয় রয়েছে, তার সকল কার্যাদিই সম্পন্ন করা হয়ে গেছে।

ইতিপূর্বে সচিবালয়ে গিয়ে এবং নারায়ণগঞ্জে বরফকলে বিআইডব্লিউটিএ ইকো পার্ক উদ্বোধনীতে যখন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এসেছিলেন, তখন সাংসদ সেলিম ওসমান শীতলক্ষ্যা নদীতে জনসাধারনের যাতায়াতের সুবিদার্থে ব্রীজ নির্মান না হওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত জনবহুল কয়েকটি ঘাটে ফেরী সার্ভিস চালুর দাবী জানিয়ে ছিলেন। আর প্রতিবারই নৌ পরিবহন মন্ত্রীর সেলিম ওসমানকে ফেরী সার্ভিস চালু করে দেয়ার আশ^াস দিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, বিগত ২০১১ সালের অক্টোবরে প্রথমবারের মত শীতলক্ষ্যা নদীতে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম নাসিম ওসমান বন্দর সেন্ট্রাল খেয়াঘাট দিয়ে ফেরী সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তখন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগমূহুর্ত হওয়ায় এটিকে নির্বাচনমুখী উন্নয়ণ কাজের অংশ হিসেবে উল্লেখ্য করে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তখন সেই ফেরী সার্ভিস কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here