নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে আলোচিত ব্যাক্তি বলতে দু’জনই আছেন।
যার মধ্যে একজন হচ্ছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কপোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। অপরজন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান।
উভয়েই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও রাজনীতিতে অভিষেক হওয়ার পর থেকেই আইভী তেমন ভাবে সক্রিয় না থাকলেও রাজনীতিতে রীতিমত ‘অলরাউন্ডার’ বনে গেছেন শামীম ওসমান- এমনটাই অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

কেননা, ১৯৬৬ সালের ৬ জুন নারায়ণগঞ্জের একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আইভী। তার বাবা সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মরহুম আলী আহাম্মদ চুনকা এবং মা তার মমতাজ বেগম। শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি বিগত ১৯৯৩ সালে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামীলীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদিকা হিসেবে রাজনীতিতে আইভীর অভিষেক ঘটলেও রাজনীতির মাঠে নিজেকে তেমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নি তিনি।

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ২০০২ সালে দেশে ফেরার পর ২০০৩ সালের নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ফের শহর আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন আইভী। কিন্তু রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ছিলেন না তিনি।

২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরেও রাজনীতিতে ওতপ্রোত ভাবেনিজেকে জড়ায়নি আইভী।

সবশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের ৩ সদস্য বিশিষ্ট ঘোষিত আংশিক কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে আইভীকে পদ দেয় কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ।

তারপরেও দলীয় কর্মকান্ডে তেমন ভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি আইভীকে। একবছরে শুধু মাত্র গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত জেলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে দলীয় নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়।

কিন্তু অত:পর রাজনীতিতে পূর্নাঙ্গ ভাবে ‘সক্রিয়’ হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা: সেলিনা হায়াত আইভী। তার সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে এমনটাই ধারনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

কারন হিসেবে তারা বলেন, জেলা আওয়ামীলীগে পদ পাওয়ার পর আইভীকে তেমন ভাবে দলীয় কর্মসূচী পালনে দেখা না গেলেও ইদানিং রাজনীতির মাঠে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে নগর ভবনের গন্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে আসছেন আইভী। সম্প্রতি সোনারগাঁয়ে দলীয় এক প্রয়াত নেতার স্মরণ সভায় যোগ দিয়ে আইভীকে সোনারগাঁয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রত্যাশী সাবেক সাংসদ আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাতের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা গেছে।

এমনকি আগামী সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি আসনেই ‘নৌকার’ প্রার্থী দিতেও বেশ জোড়ালো ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে আইভীকে। এছাড়াও গত ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবস উপলক্ষ্যে শহরের দলীয় কার্যালয়ে জেলা আওয়ামীলীগ আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভায়ও আইভীকে বেশ রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

তাই বলা বাহুল্য, পদ থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে এতদিন ‘নিষ্ক্রিয়’ থাকা সিটি মেয়র আইভী এখন ‘সক্রিয়’ হতে শুরু করেছেন।

অপরদিকে, আইভীর অঘোষিত প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত তরুণ প্রজন্মের চেতনার প্রতীক সাংসদ শামীম ওসমান দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন কাটিয়ে রাজনীতিতে হয়ে গেছেন এখন ‘অলরাউন্ডার’। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ মানেই, যাকে একবাক্যে সবাই মানে ও গণ্য করে থাকেন নেতাকর্মীরা।

শামীম ওসমান ১৯৬১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হলেন ভাষা সৈনিক মরহুম একেএম শামসুজ্জোহা এবং মাতা ভাষা সৈনিক মরহুম নাগিনা জোহা।

জানাগেছে, ৮০’র দশক থেকে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন শামীম ওসমান। তিনি যখন অস্টম শ্রেণীর ছাত্র ,সে সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে পোস্টার লাগাতে গিয়ে পুলিশের বেধড়ক পিটুনীরর শিকার হয়েছিলেন।

৮০’র দশকের প্রথমভাগে মরকারী তোলারাম কলেজের ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে শামীম ওসমানের রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে ৮১ সালে ভিপি নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার শত্রুদের ব্যাপারে আপোষহীন এ নেতা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কাঁপিয়ে তুলেন। স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম করতে গিয়ে করেছেন বারবার কারাবরণ। পরবর্তীতে শহর আওয়ামী লীগ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার লংমার্চের গাড়ীবহর আটকে দিয়ে রাজনীতিতে বেশ আলোচিত হয়ে উঠেন শামীম ওসমান।

এরপর ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেন। পার্লামেন্টে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে, বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে স্বাধীনতা বিরোধীদের নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে, নারায়ণগঞ্জের কলংক টারবাজার পতিতাপল্লী উচ্ছেদ ও পতিতাদের পুনর্বাসন করে আলোচিত হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে বিগত ২০১১ সালে দলীয় সমর্থণে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে মেয়র প্রার্থী হিসেবে আইভীর কাছে পরাজিত হলেও ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শামীম ওসমান জানেন রাজনীতি কিভাবে করতে হয়। আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বিচক্ষনতার কারনেই তিনি এখন ‘অলরাউন্ডার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কারন, শামীম ওসমানই এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি আহ্বান জানালে মুহুর্তেই রাজপথে লাখো নেতাকর্মীকে জড়ো করে ফেলতে পারেন। কাকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করলে জনগণ উপকৃত হবেন আর কাকে কোন কমিটিতে পদ দিলে দল সু-সংগঠিত হবে, সেটা ভাল বুঝতে ও করার ক্ষমতা আছে বলেই শামীম ওসমান আজ আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি হলেও কিভাবে আবার ঐক্যের সূচনা করা যায়, সেই ক্ষেত্রেও শামীম ওসমান নিজেকে একজন পরিপক্ক রাজনীতিবিদ হিসেবে জাহির করতে সক্ষম হয়েছেন। যার জ¦লন্ত উদাহরন সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন ইস্যুতে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন, সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহাসহ একাধিক নেতৃবৃন্দের সাথে সর্ম্পকের বৈরীতা সৃষ্টি হওয়ার পরেও পুনরায় সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নজির।

তাই সর্বোপরি স্বীকার করতেই হবে, রাজনীতিতে শামীম ওসমান ‘অলরাউন্ডার’- বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here