নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: ‘নারায়ণগঞ্জের মাটিতে সন্ত্রাসীদের ঠাঁই হবে না। আমি কোন টেন্ডারবাজি করি না। অপরাধী যদি আমার সন্তানও হয় তবে তাকে ছাড় দিব না।’ প্রায়ই এমন ধরনের বক্তব্য দিয়ে জনসাধারনের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী।
কিন্তু আসন্ন কোরবানীর ঈদকে ঘিরে সিদ্ধিরগঞ্জের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে হাটের ইজারা দিতে খোদ নিজেই টেন্ডারবাজি করায় এখন নিষ্ঠাবান আইভীর নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করছেন নগরবাসী।

সচেতন মহলের মতে, ‘সততা ও নিষ্ঠার কারনে যেই আইভী শুধু নারায়ণগঞ্জবাসী নয়, গোটা দেশবাসীর কাছেই ব্যাপক পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, সেই আইভীই এবার একজন সন্ত্রাসীকে কিভাবে হাটের টেন্ডার দিলেন তা বোধগম্য নয়।’

‘তবে কি সিটি কর্পোরেশনের বড় বড় কাজের টেন্ডার গুলো তার প্রিয়জন ঠিকাদার আবু সুফিয়ানকে আইভী নিজেই পাইয়ে দিতেন, যা এতদিন একটি পক্ষ দাবী করে আসলেও আজ খোদ আইভী নিজেই তা প্রমাণ করে দিলেন, একজন সন্ত্রাসীর কাছে তবে কি আইভী নীতিকে বিসর্জন দিলেন?’ এমনই অনেক প্রশ্নের উদ্রেগ হয়েছে এখন জনমনে।

কেননা, হাটের সিডিউল বিক্রয়ে মেয়রের কাছে যেন নিরুপায় ছিলেন খোদ নাসিকের প্রধান নির্বাহী।

জানাগেছে, এবার নাসিকের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ১০টি ওয়ার্ডে প্রতিটিতে একটি করে মোট ১০টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়। এরমধ্যে ৪নং ওয়ার্ডে টাইগার রি-রোলিং মিলের মাঠের হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৭ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছে শফিকুল ইসলাম শফি।

এমন অবস্থায় গত ২৪ আগস্ট আকষ্মিকভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ৪নং ওয়ার্ডে নতুন ২টি হাটের দরপত্র আহবান করে। একটি শিমরাইল তাজ জুট মিল মাঠে, অন্যটি নয়াআটি গ্রামের আর এম আর ওয়েল মিলসের পশ্চিম পাশের মাঠে। ২৮ আগস্ট সোমবার বিকাল ২টায় দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ও একই দিন বিকাল ৩টায় দরপত্র খোলার সময় নির্ধারন করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। শনিবার সকাল ৯টা থেকে রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত সিডিউল বিক্রির সময় নির্ধারন করা হয়। সিটি কর্পোরেশনের দুটি আঞ্চলিক কার্যালয় সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুল, নগর ভবন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যলয় থেকে দরপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার স্থান নির্ধারিত থাকলেও শুধু মাত্র নগর ভবন থেকে সিডিউল বিক্রি করা হয়।

কিন্তু নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী তার নিজের পছন্দের লোককে হাটের ইজারা পাইয়ে দিতে একটি পক্ষের কাছে সিডিউল বিক্রি করলেও অন্যদের সিডিউল কিনতে দেননি। এমনকি সিডিউল কিনতে আসা একজনকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে শাসিয়ে দিয়েছেন। ওই সময় মেয়রের রুমে সাত খুন মামলার অন্যতম আসামী নূর হোসেনের সহযোগী সাদেকুর রহমান ও বন্ধ হয়ে যাওয়া আদমজীর জুট মিলের সাবেক শ্রমিক নেতা রিয়াজ উদ্দিন রেনু উপস্থিত ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত সিডিউল কিনতে না পেরে ৪ ব্যাক্তি সাংবাদিকদের কাছে আভিযোগ করে এসব কথা বলেন। অভিযোগকারী সুমন, চঞ্চল, বিটু ও আলামিন জানান, ‘শুধুমাত্র সিদ্ধিরগঞ্জের অন্যতম আলোচিত সন্ত্রাসী নজরুলের লোকজনের কাছেই সিডিউল বিক্রি করা হয়েছে। যাকে নারায়ণগঞ্জের মানুষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে জানতেন সেই আইভীর এমন আচরণে আশ্চর্য হয়েছেন সিডিউল নিতে আসা লোকজন। কারণ মেয়র আইভীর যে জনপ্রিয়তা তা অর্জিতই হয়েছিল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলে।’

সিডিউল না পেয়ে তারা আরো অভিযোগ করেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও গাড়ি চোর সিন্ডিকেটের সদস্য নজরুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি নজরুলকে হাটের ইজারা পাইয়ে দিতে মেয়রের রুমে সকাল থেকে অবস্থান নেন সাদেকুর রহমান ও রিয়াজ উদ্দিন রেনু। তাদের পরামর্শে মেয়র তড়িগড়ি করে শেষ মুহুর্তে এই দুটি হাটের ইজারা আহবান করেন।’

সিডিউল কিনতে না পেরে সুমন সংবাদিকদের বলেন, ‘সিডিউল কেনার জন্য দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত নগর ভবনে অপেক্ষা করেছি। শিমরাইল তাজ জুট মিল মাঠ হাটের সিডিউল কিনতে না পেরে তিন দফা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এফ এম এহতেশামুল হকের কাছে যাই। কিন্তু তিনি অসহায়ত্ব বোধ করে বলেন, আমি চাইলে তো আর হবে না। এক পর্যায়ে তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যান। বিকাল ৫টা পর্যন্ত আর অফিসে ফিরে আসেননি তিনি।’

সুমন আরো বলেন ‘প্রধান নির্বাহীকে না পেয়ে রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মেয়রের রুমে যাই। তিনি সিডিউল কিনতে আসার কারণ জানতে চান। এক পর্যায়ে শাসিয়ে বলেন, তোমার বাড়ি দেওভোগে। তুমি ওই এলাকার হাটের সিডিউল কিনতে এসেছো কেন? সিডিউল দেয়া যাবে না। পরে মেয়রের রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় পেছন থেকে রিয়াজ উদ্দিন রেনু বলেন, এবার খেলা জমবে। সিডিউল নিয়ন্ত্রণে সন্ত্রাসী নজরুলের লোকজনকে নগর ভবনে বিকেল পর্যন্ত অবস্থান করে।

এব্যাপারে সিটি মেয়র আইভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ওই হাটের সিডিউল দেয়া হবে না। সিডিউল না দিলে হাট ইজারা বিজ্ঞপ্তি কেন দেওয়া হলো জানতে চাইলে প্রতিউত্তরে মেয়র বলেন, বিষয়টি আপনারা (সাংবাদিকরা) চেপে গেলেই পারেন।’

এদিকে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবসময় অবস্থান নেয়া সিটি মেয়র আইভীর এবার সন্ত্রাসের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় জনমনে বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, মেয়র আইভী কি তবে নীতি ভ্রষ্ট করতে চলেছেন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here