নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: বছর ঘুরে ক্যালেন্ডারের পাতায় আবারো এলো ২৭ এপিল। অর্থাৎ, নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে আলোচিত সাত খুনের ৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে শুক্রবার।
চার বছর পূর্বে ২০১৪ সালের এই দিনে একসঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবীসহ সাত জনকে অপহরণের পর ঠান্ডা মাথায় হত্যা ও গুমের উদ্দেশ্যে শীতলক্ষ্যায় রাতের আঁধারে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিল আইনশৃংখলা বাহিনীর বিপদগামী সদস্যরা।

যাদের নৃশংসতায় ঐদিন শিউরে উঠেছিল মানুষ। আতঙ্ক ও কান্নার নগরীতে পরিণত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ। গণমাধ্যম ও সারা দেশের মানুষের মনে নাড়া দিয়েছিল হৃদয় বিদারক এই ঘটনার। দোষীদের বিচার দাবীতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সিদ্ধিরগঞ্জ।

পরিশেষে সাত খুনে জড়িতদের আদালতে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের পর নিহতদের স্বজনরা দোষীদের সাজা দেখার অপেক্ষায় রইলেও এখন সর্বোচ্চ আদালতে সেই সাজা কমানোর প্রত্যাশায় আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, মৃত্যুদন্ড ও কারাদন্ড প্রাপ্ত আসামীরা বলে জানান তাদের আইনজীবীরা।

যা ঘটেছিল সেদিন

বিগত ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের পাশে র‌্যাবের সদস্যরা চেকপোস্ট বসিয়ে আদালত থেকে বাসামুখী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলামের গাড়ি থামায়। এরপর র‌্যাব গাড়ি থেকে নজরুল, তাঁর তিন সহযোগী ও গাড়ি চালককে তুলে নিয়ে যায়। এ সময়ে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী চন্দন সরকার। তখন তিনি নজরুলকে অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় তাঁকে ও তাঁর গাড়ি চালককেও তুলে নিয়ে যায় র‌্যাব।

সাত জনকে অপহরনের পর তাঁদের সবাইকে হত্যা করে ওই রাতেই পেট কেটে এবং ইটের বস্তা বেঁধে সবার লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেয় র‌্যাব সদস্যরা।

একইদিনে একই স্থান থেকে জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবীসহ ৭ জন অপহরন হওয়ার ঘটনায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে জনমনে। পরদিন থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইলে সড়ক অবরোধ করে অগ্নি সংযোগ, গাড়ী, অফিস ভাংচুর চালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে স্থানীয় জনতা। রীতিমত উত্তাল হতে থাকে নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু তখনো কেউ জানতো না যে, অপহৃত সাত জনকেই খুন করে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিল র‌্যাব সদস্যরা।

এরপর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর ত্রিমোহনায় ছয়জন ও পরদিন একজনের লাশ ভেসে উঠার পর নিহতদের স্বজনরা তাদের লাশ সনাক্ত করে নিয়ে যান।

মামলা ও বিচার

সাত খুনের ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীণ সহ-সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে ৬ জনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি।

তারপর আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই বিজয় কুমার পালও বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় আরও একটি মামলা করেন।

কিন্তু ৭ খুনের ঘটনার পরপরই নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম অভিযোগ তোলেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছে নূর হোসেন। একসঙ্গে সাত জনকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা ও গুমের নৃশংসতায় শিউরে ওঠে মানুষ। বিশেষ করে, তারেক সাঈদ ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা হওয়ায় বিষয়টি তখন ভিন্ন মাত্রা পায়।

এরপর এই অভিযোগের পরই ২০১৪ সালের ৬ মে র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে চাকুরীচ্যুৎ করা হয়।

পরবর্তীতে ১৭ মে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকার সেনানিবাস এলাকা থেকে মিলিটারী পুলিশ, ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ ও নৌ-বাহিনীর গোয়েন্দারা এম এম রানাকে আটক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে তুলে দেন। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাবের এই তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। এ তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এই হত্যাকান্ডের পর একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের টেলিফোনে কথোপকথনের বিষয়টি প্রচার করে। তখন বিষয়টি নিয়ে আরও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সাত খুনের পর নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে যায়।

কিন্তু ২০১৪ সালের ১৪ জুন রাতে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের কাছে কৈখালী এলাকার একটি বাড়ি থেকে নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে বাগুইআটি থানার পুলিশ। পরে ওই বছরের ১৮ আগস্ট নূর হোসেন, ওহাদুজ্জামান শামীম ও খান সুমনের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বারাসাত আদালতে চার্জশীট জমা দেয় বাগুইআটি থানা পুলিশ। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দমদম কারাগার কর্তৃপক্ষ নূর হোসেনকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করতে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এরপর ১৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ আদালতে উপস্থাপন করা হয় নূর হোসেনকে।

দীর্ঘ ১১ মাসের তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ভারতের কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা সংস্থার অফিসার-ইন-চার্জ মামুনুর রশীদ মন্ডল।

চার্জশীটে বিউটির দায়েরকৃত মামলার এজাহারভুক্ত ৫ আসামীর অব্যাহতির আবেদন করা হয়। মামলায় ১২৭ জনকে সাক্ষী করা হয়। আর উদ্ধার দেখানো হয় ১৬২ ধরনের আলামত।

এরপর, সাত খুনের দু’টি মামলায় গ্রেফতারকৃত ২৩ আসামীর উপস্থিতিতে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে চার্জ গঠন করা হয়। শুনানীর সময়ে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা ২৩ আসামীকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করে পলাতক ১২ জনসহ অভিযুক্ত ৩৫ জনের বিরুদ্ধেই চার্জগঠনের নির্দেশ দেন।

তারপর, সাত খুনে অভিযুক্ত পলাতক ১২ আসামীর অনুপস্থিতিতেই শুরু হয় মামলার বিচার প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সাত মাসে ৩৮ কর্ম দিবস চলে মামলার কার্যক্রম ও শুনানী। এরপর ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারী তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২৬ জনের মৃত্যুদন্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদানের মাধ্যমে আলোচিত সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা করেন।

সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৫ জন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে প্রেষণে র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন। অপরাধের সময় তারা সবাই র‌্যাব-১১’তে কর্মরত ছিলেন। সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে ১১ জন সেনাবাহিনীর, ২ জন নৌবাহিনীর, ৩ জন বিজিবির, ৭ জন পুলিশ ও ২ জন আনসার সদস্য ছিলেন। সাত খুনের মামলার পর তাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

নিন্ম আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ড পেয়েছিলেন, সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক দুই কোম্পানী কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম এম মাসুদ রানা, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, এ বি মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সৈনিক আবদুল আলিম (পলাতক), সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি (পলাতক), সৈনিক আল আমিন (পলাতক), সৈনিক তাজুল ইসলাম (পলাতক), সার্জেন্ট এনামুল কবির (পলাতক), নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান চার্চিল, সেলিম (পলাতক), সানাউল্লাহ সানা (পলাতক), শাহজাহান (পলাতক) ও জামাল সর্দার (পলাতক)।

১০ বছর সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল, ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন, এএসআই বজলুর রহমান, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনস্টেবল বাবুল হাসান, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, এএসআই কামাল হোসেনকে (পলাতক)।

আর কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (পলাতক), হাবিলদার নাসির উদ্দিনকে সাত বছরের কারাদন্ড দিয়েছিল আদালত। এছাড়া অপহরণে যুক্ত থাকার দায়ে ১০ বছর ছাড়াও আলামত অপসারণে যুক্ত থাকার দায়ে কর্পোরাল মোখলেছুর রহমানকে আরও সাত বছর কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছিল আদালত।

হাইকোর্টেও সাজা বহাল

নিন্ম আদালতের সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন সাত খুনে দন্ডপ্রাপ্তরা। পরবর্তীতে ২০১৭ বছরের ২২ আগষ্ট নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আসামীপক্ষের আপিল শুনানী শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের বেঞ্চ সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানী কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখেন।

আর বাকী ১১ আসামীর মৃত্যুদন্ডেরসাজা কমিয়ে তাদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। পাশাপাশি নিম্ন আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রাপ্ত ৯ আসামীর সাজাও বহাল রাখেন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ।

এব্যাপারে নূর হোসেনের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ ও তারেক সাঈদের আইনজীবী ফজলুল হক খান ফরিদসহ অন্যান্য আসামীর আইনজীবীরা ন্যায় বিচার না পাওয়ার দাবী করে রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিভিল মিস পিটিশন (সিএমপি) এর মাধ্যমে আপিল করার সিদ্ধান্ত জানান।

তবে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্সের ও আপিলের পুর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশের পরই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হবে বলে জানান, আসামীপক্ষের একাধিক আইনজীবী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here