নিউজ প্রাচ্যের ডান্ডি: মহাজোট ভেঙ্গে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ থেকে জাতীয় পার্টি বেরিয়ে এসে বর্তমানে দেশের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলেও নারায়ণগঞ্জ জেলায় আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে মহাজোটের মতই সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।
যার ফলে গত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে এবং ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) ও নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসন জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে অনেকটা ঐকবদ্ধ ছিল এই দল দু’টির নেতাকর্মীরা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে দলীয় যেকোন কর্মসূচী পালনেও দু’টি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দরা এক হয়ে যেত। আর এই দল দু’টির নেতাকর্মীদের মাঝে মেলবন্ধনের নেপথ্যে যারা ছিলেন এবং আছেন, তারা হলেন, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের সাংসদ ভ্রাতৃদ্বয়।

তবে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টিকে একত্রিত করে রাখার মূলে সবচেয়ে বেশী যার ভূমিকা ছিল, তিনি হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম নাসিম ওসমান।

যিনি বিগত ২০১৪ সালের জুনে মারা যাওয়ার পর তার শূণ্য আসনে পুনরায় জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হন তারই অনুজ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম সেলিম ওসমান।

আর অপরজন হচ্ছেন, তাদের সর্বকনিষ্ট ভ্রাতা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামীলীগের হেভীওয়েট সংসদ সদস্য আলহাজ¦ একেএম শামীম ওসমান। তবে বিগত ২০১৪ সালে আওয়ামীলীগের ছাড়ে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসন থেকে জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আলহাজ¦ লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনিও স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দদের সাথে নিয়েই কাজ করে আসছেন।

যার ফলে কয়েকমাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিম ওসমানের অর্থায়নে নির্মিত একটি স্কুল উদ্বোধনীতে এসে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন দেখে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ বলেই ফেলেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগ আর জাতীয় পার্টি বলতে আলাদা কিছুই নেই। নারায়ণগঞ্জে এখন সবাই ওসমানলীগ।’

কিন্তু আওয়ামীলীগ আর জাতীয় পার্টির মধ্যকার সম্পর্ক ভাল থাকলেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সম্প্রতি বেঁকে বসেছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। যারা আগামী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি আসনেই ‘নৌকার’ প্রার্থী দেয়ার জোর দাবী জানিয়ে করে আসছেন জাতীয় পার্টির বিষেদাগার।

তন্মধ্যে জেলার ৫টি আসনেই প্রথম ‘নৌকার’ প্রার্থী দাবী করে জাতীয় পার্টিকে একটি আসনও ছাড় না দেয়ার অভিমত ব্যক্ত করেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই।

এরপর থেকেই নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগে শুরু হয় জাপা বিদ্বেষী আন্দোলন। আস্তে আস্তে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দদের কাছ থেকে ৫টি আসনেই আওয়ামীলীগের প্রার্থী দেয়ার জোর দাবী উথাপিত হতে থাকে।

তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহিদ বাদল মুখে জাতীয় পার্টির কথা না বললেও দাবী জানাচ্ছেন সব আসনেই আওয়ামীলীগের প্রার্থী দেয়ার। আর কেউ কেউ জাতীয় পার্টির পাশাপাশি দলটির বর্তমান দুইজন সাংসদ সেলিম ওসমান ও লিয়াকত খোকার প্রতি প্রকাশ করেন ক্ষুব্ধ মনোভাব।

জাতীয় পার্টির ঘোর বিরোধীতা করে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা: সেলিনা হায়াত আইভী, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আনোয়ার হোসেন, সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা, সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মাহমুদা মালা, জেলা যুবলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদির, জেলা স্বেচ্ছা সেবকলীগ আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের আওয়ামীলীগের সাবেক সাংসদ আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত, জেলা আওয়ামীলীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ¦ জাহাঙ্গীর আলম।

কিন্তু গত ২৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের অর্থায়নে বন্দরে নির্মিত তিনটি স্কুলের উদ্বোধনীতে এসে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়সহ জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ এবং জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দেয়ায় এখন বিপাকে পড়েছেন, আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে হঠাৎ জাতীয় পার্টির বিরোধীতা করে আসা আওয়ামীলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দরা বলে দলীয় সূত্রে জানাযায়।

নাম প্রকাশে আওয়ামীলীগের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, ‘যেহেতু আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দদের নারায়ণগঞ্জকে ঐক্যবদ্ধ রাখার তাগিদ দিয়েছেন, সেহেতু আওয়ামীলীগে থাকা জাপা বিদ্বেষীরা আর প্রকাশ্যে জাতীয় পার্টির বিরোধীতা করতে পারবেনা। কিন্তু ৫টি আসনে ‘নৌকার’ প্রার্থী দেয়ার দাবী করতেই পারবেন আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দরা। সেক্ষেত্রে যদি নির্বাচনের আগ মূহুর্তে জাতীয় পার্টি আওয়ামীলীগের সাথে পুনরায় জোট গঠন করে, তখন কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড নারায়ণগঞ্জের কোন আসন অন্য কোন দলকে ছাড় দিলে সেটা আমাদের মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।’

উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ একেএম সেলিম ওসমানের অর্থায়নে বন্দরে নির্মিত তিনটি স্কুল উদ্বোধনীতে গত ২৩ নভেম্বর প্রথমবারের মত নারায়ণগঞ্জ আসেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এরপর মদনপুর ইউনিয়নের বাগদোবাড়িয়া এলাকায় নাগিনা জোহা উচ্চ বিদ্যালয় ও ধামগড় ইউনিয়নের হালুয়াপাড়া দশদোনা এলাকায় শেখ জামাল উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্বোধনের পূর্বে বন্দরের ত্রিবোনী মিনারবাড়ি এলাকায় শামসুজ্জোহা মুছাপুর বন্দর (এম.বি) ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্বোধনের পর এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে ওবায়দুল কাদের জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিম ওসমানের আতীথিয়তায় মুগ্ধ হয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জের অতীত ইতিহাস স্মরণ করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামের সূঁতিকাগার এই নারায়ণগঞ্জ। আমাদের সকল সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জ থেকে গড়ে উঠেছিল দূর্বার আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন, সংগ্রামে সাথে সাথী ছিল এই নারায়ণগঞ্জ।’

বিএনপির বিগত সময়ের নাশকতার বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিএনপি কী পেট্রোল বোমা মেরে শত শত মানুষ পুড়িয়ে মেরে ফেলার কথা ভুলে গেছে। বিএনপি আন্দোলনের হাকডাক দিক পেট্রোল বোমার ভয় দেখিয়ে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছে। তাদের আন্দোলনের সক্ষমতা নেই সাহস নেই। জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনে জনগণ থেকে বিএনপি বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আমার তো মনে হয় আবারও তারা সেই বিভীষিকাময় কর্মকান্ডে প্রত্যাবর্তন করে আরো জনবিচ্ছিন্ন হবে। এ ঝুঁকি নিবে কী না এটা বিএনপি সিদ্ধান্ত নিবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলনের ডাক আষাঢ়ের তর্জন গর্জনেই সার সেটা গত সাড়ে ৮ বছরে প্রমাণিত হয়ে গেছে। তারা এখন বলছে পেট্রোল বোমার বদলে লোহার হাতুড়ি দিয়ে আন্দোলন করবে। বিএনপি এখন অস্ত্রের ভাষায় কথা বলছে। অস্ত্রের ভাষায় যারা কথা বলে তাদের পরিণতি অত্যন্ত করুণ ও ভয়াবহ। যারা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে তারা ক্ষমতায় এলে কী হবে তা বাংলাদেশের মানুষ ভালো জানে।’

এজন্য ওবায়দুল কাদের আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দদের তাগিদ দেন।

তিনি বলেন, ‘সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের সম্মানিত ও প্রভাবশালী নেতা। তাই এখানের মহানগর, জেলা আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির সকল নেতাদের আমি বলবো আপনারা নারায়ণগঞ্জকে ঐক্যবদ্ধ রাখুন। এখানে সবাই এক থেকে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here