নিউজ প্রাচ্যর ডান্ডি: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর কারনে প্রত্যাশিত বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসতে না পারায় হকারদের অবিরাম আন্দোলন ‘নিস্ফল’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল।
অপরদিকে, হকারদের দাবীর প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে হলিডে মার্কেটের মতই সপ্তাহে দুই দিন শুক্র ও শনিবার বসার সুযোগ দিতে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের এমপি সেলিম ওসমান মেয়র আইভীর কাছে অনুমতি চাওয়ার স্বদিচ্ছা পোষণ করলেও শেষতক তিনিও এক্ষেত্রে ‘ইউটার্ন’ করেছেন বলে জানান, হকার নেতারা।

ফলে প্রায় ২ মাস যাবত ফুটপাতে বসার সুযোগ না পেয়ে অনাহারে অর্ধহারে পরিবার নিয়ে দূর্বিসহ দিন কাটাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু সড়কের কয়েক হাজার ঋণগ্রস্থ হকার। ফুটপাতে বসার দাবীতে অবিরাম আন্দোলন করাসহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে আসামী বনে গেলেও দাবী পূরণ না হওয়ার ক্ষোভে রীতিমত দিশেহারা হয়ে গেছেন গরীব হকাররা।

শুধু তাই নয়, নিজে হকার হলেও সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলতে স্কুলে ভর্তি করিয়ে এখন অর্থাভাবে তাদের লেখাপড়ার খরচও জোগাতে পারছেন না অধিকাংশ হকার বলে জানান নেতারা।

এদিকে, দাবী আদায়ে ফের হকাররা আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিলে গত ৩১ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস্ ক্লাবে হকার নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেন সেলিম ওসমান।

তখন হকার নেতারা সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার হলিডে মার্কেটের মত বঙ্গবন্ধু সড়কে হকারদের বসতে দেওয়ার দাবী রাখেন।

পরিপ্রেক্ষিতে সেলিম ওসমান পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কে বিকেল ৫ টার পর অস্থায়ী ভাবে ফুটপাতে হকারদের বসতে দিতে মেয়রের কাছে অনুরোধ জানিয়ে অনুমতি চাওয়ার আশ্বাস দেন।

এরপর সর্বশেষ গত ১৩ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে হকার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন এবং হকার নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় বসেন এমপি সেলিম ওসমান।

উক্ত সভায় জেলা প্রশাসক মো: রাব্বী মিয়া ছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডাক্তার সেলিনা হায়াত আইভীর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ আলী ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমিনুল ইসলাম। আর আন্দোলনরত হকারদের পক্ষে ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ হকার্স সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মো: আসাদুল ইসলাম আসাদ ও সিপিবি জেলা সভাপতি কমরেড হাফিজুল ইসলাম।

তখন উন্নত চিকিৎস্বার্থে মেয়র আইভী করছিলেন সিঙ্গাপুরে অবস্থান।

সেদিন সভায় হকারদের পক্ষ থেকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার হলিডে মার্কেটের মত বঙ্গবন্ধু সড়কে হকারদের বসতে দেওয়ার দাবী রাখেন হকার নেতৃবৃন্দরা।

পরিপ্রেক্ষিতে এমপি সেলিম ওসমান বলেছিলেন, শুক্র ও শনিবার বঙ্গবন্ধু সড়কে হকারদের বসার দাবীটি সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত ভাবে জানাতে হবে। সিটি মেয়র অনুমতি দিলেই কেবল ওই দুই দিন বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসতে পারবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রকৃত হকার হতে হবে এবং তাদের কাছে পরিচয় পত্র থাকতে হবে। জেলা পুলিশ প্রশাসন সেই পরিচয় পত্র তৈরি করে দিবেন। অন্যথায় কোন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসতে পারবে না। আর যারা হলিডে মার্কেটের মত বঙ্গবন্ধু সড়কে সপ্তাহে দুই দিন দোকান বসিয়ে ব্যবসা করবে তাদেরকে বন্দরে ময়মনসিংহ পট্টিতে হকারদের জন্য মার্কেট করা হলে সেখানে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে না।

তারপর সম্প্রতি মেয়র আইভী দেশে ফেরার পর হকার নেতৃবৃন্দরা সপ্তাহে দুইদিন বঙ্গবন্ধু সড়কে বসার অনুমতি চাইতে সেলিম ওসমানকে মেয়রের সাথে আলোচনার অনুরোধ জানান। কিন্তু প্রতিউত্তরে নাকি সেলিম ওসমান উল্টো হকারদেরই মেয়রের কাছে অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার নেতা বলেন, এমপি সেলিম ওসমান সপ্তাহে দুইদিন বঙ্গবন্ধু সড়কে হকারদের বসার সুযোগ করে দিতে প্রথমে মেয়রের কাছে নিজেই অনুমতি চাওয়ার কথা বললেও এখন তিনি আমাদের অনুমতি চাইতে বলছেন। এমপি সাহেব বলেছেন, ‘আমি মেয়রের চেয়ে ছোট নাকি যে অনুমতি চাইবো। তোরাই অনুমতি চা।’

আর সেলিম ওসমান এখন অনুমতি চাওয়ার ব্যাপারে ইউটার্ন নেয়ায় ফের ভুখা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন হকাররা বলে নিশ্চিত করেছেন একাধিক হকার নেতা।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের অনবরত উচ্ছেদ অভিযানের কারনে যখন দিশেহারা হয়ে আন্দোলনরত হকাররা এমপি, মেয়র, ডিসি, এসপির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেও ফুটপাতে বসার সুযোগ পাচ্ছিলেন না, তখন গত ১৫ জানুয়ারী চাষাড়ায় বৃহৎ প্রতিবাদ সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জ হকার্স সংগ্রাম পরিষদ।

এরপর সেদিন সেই সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান যখন উপস্থিত হন, তখন নিজেদের কষ্টের কথা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বয়োবৃদ্ধ হকারসহ তাদের স্ত্রী সন্তানেরা।

পরবর্তীতে গরীব হকারদের কষ্টে আবেগাপ্লুত শামীম ওসমান ১৬ জানুয়ারী বিকেল ৫ টা থেকে নগরীর ফুটপাতে হকারদের বসার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তিনি মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারী উচ্চারন করে আরো বলেন, ‘ফুটপাতে হকাররা বসবে, এটা কোন অনুরোধ নয়। এটা শামীম ওসমানের নির্দেশ। আমি নিজে উপস্থিত থেকে হকারদের সুশৃংখল ভাবে ফুটপাতে বসার ব্যবস্থা করে দিব। এরপরেও যদি কোন হকারকে উচ্ছেদ করা হয়, তবে সেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে আমি রুখে দাঁড়াবো।’

তারপর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৬ জানুয়ারী বিকেলে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস্ ক্লাবে অবস্থান করে দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে ফুটপাতে হকারদের বসার ব্যবস্থা করাকালীন সময়ে হকারদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন জানানোর লক্ষ্যে নগর ভবন থেকে ফুটপাতের উপড় দিয়ে পদযাত্রা বের করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় মুক্তি ক্লিনিকের সামনে আইভী সমর্থকরা ফুটপাতে রাখা হকারদের চকি তুলে রাস্তায় ফেলে দেয়ার সময় বাঁধা দিতে যান শামীম ওসমানের কর্মী নিয়াজুল।

তখন নিয়াজুলকে আইভী সমর্থকরা দু’দফা ধাক্কা দিলে নিয়াজুল নিজের সাথে থাকা লাইসেন্সকৃত অস্ত্র উচিয়ে ফাঁকা গুলি বর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু পিস্তল থেকে গুলি বের না হওয়ায় আইভী সমর্থকরা নিয়াজুলকে ফুটপাতে ফেলে গণধোলাই দেয়া শুরু করলেই বিপরীত দিক থেকে বিক্ষুব্ধ হকাররা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে শামীম ওসমান ও আইভী সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ব্যাপক সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সেসময় মেয়র আইভী রাস্তায় বসে পড়লে তার সাথে থাকা কর্মী সমর্থকরা মানবঢাল করে তাকে রক্ষা করেন। তারপর এই সংঘর্ষের জন্য আইভী শামীম ওসমানকে প্রকাশ্যে দোষারোপ করলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শামীম ওসমান আইভীকে ঢাকায় তলব করা হয়। সর্বত্রই সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।
আর এই সংঘর্ষের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি এখনো তদন্ত কাজ চালিয়ে গেলেও অজ্ঞাত ৫/শ’ হকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে সদর মডেল থানা পুলিশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here